মাসে ১শ’ ৩০ ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকেন এই নারী!

মাসে ১শ’ ৩০ ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকেন এই নারী!

দাঁড়িয়ে থাকাটাই কাজ। রোদ-বৃষ্টি, ঝড় যাই হোক রাস্তায় দাঁড়াতেই হয়। ভোরের আলো ফুটে ওঠার পরপরই প্রয়োজনীয় কাজকর্ম শেষ করে রাস্তায় দাঁড়িয়ে পড়েন নূরে শেফা। সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত প্রতিদিনই রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকেন তিনি। কখনো ডিবি রোড, কখনো সার্কুলার রোড আবার কখনো অন্য কোনও সড়কে।
প্রতিদিন পাঁচ ঘণ্টা ধরে শুক্রবার বাদে সপ্তাহের ছয় দিনে ৩০ ঘণ্টা আর মাসে ২৬ দিনে ১৩০ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে কর্তব্য পালন করেন গাইবান্ধা ট্রাফিক বিভাগের প্রথম ও একমাত্র নারী সার্জেন্ট নূরে শেফা। সার্জেন্ট হিসেবে যোগদানের পর প্রথমে ডিএমপি, এরপর মফস্বল শহর গাইবান্ধায় পুরুষ সহকর্মীদের পাশাপাশি সমান তালে কর্তব্য পালন করে যাচ্ছেন।
শহরের যানজট নিরসনে ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট ছাড়াও চালকদের লাইসেন্স, যানবাহনের কাগজপত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা, চালকদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি পথচারীদের পারাপারে সহযোগিতা করেন তিনি।
কর্তব্য পালন করতে গিয়ে নারী হওয়ার কারণে অনেক সময় বিব্রতকর পরিস্থিতিতেও পড়তে হয় নূরে শেফাকে। বলছিলেন, সপ্তাহ খানেক আগের কথা। মোটরসাইকেলের হ্যান্ডেলে হেলমেট ঝুলিয়ে যাচ্ছিলেন একজন চালক। শহরের সাদুল্লাপুর মোড়ে সংকেত দিয়ে থামিয়ে মামলা দিলে অশোভন আচরণের শিকার হন তিনি। সিভিলে পেলে পোশাক খুলে নেয়ার হুমকি দিয়ে চলে যান ওই চালক।
বিব্রতকর এমন অনেক অভিজ্ঞতার মধ্যেও অনেক ভালো লাগাও কাজ করে ট্রাফিক সার্জেন্ট নূরে শেফার। তিনি বলেন, অদক্ষ আর অপ্রশিক্ষিত চালকদের কারণে ব্যস্ততম শহরে যানজট হলে অনেক মানুষকে ভোগান্তি পোহাতে হয়। আটকা পড়ে মুমূর্ষ রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্সও। তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিয়ে মানুষের চলাচল স্বাভাবিক করার পর কোনও কষ্টই আর মনে থাকে না তার।
শহরে কোনও পুলিশ বক্স নেই, সুযোগ নেই বিশ্রামেরও। রোদ কিংবা বৃষ্টিতে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক কষ্ট করতে হয়। মানুষের দোকানের ঝুপড়ি কিংবা চায়ের দোকানে আশ্রয় নিতে হয়। সবচেয়ে সমস্যায় পড়তে হয় ওয়াশরুম নিয়ে। রাস্তাঘাটের আশপাশে তেমন পাবলিক টয়লেট না থাকায় অস্বস্তিতে পড়তে হয় তাকে। পুরুষ সহকর্মীরা চাইলে যে কোনও জায়গায়, হোটেলে বা কোনও বাড়িতে যেতে পারেন কিন্তু নারীরা সবখানে যেতে পারেন না। এসব মেনে নিয়েই তিন বছর ধরে সড়কে শৃঙ্খলা বজায় রাখার কাজ করছেন শেফা।
সোমবার (৮ মার্চ) নারী দিবসের সকালে পুলিশ মহাপরিদর্শকের পাঠানো একটি খুদেবার্তা দেখে চমকে যান তিন। নূরে শেফা বলছিলেন, বিভাগের সর্বোচ্চ কর্তার অভিনন্দন বার্তা তাকে অনুপ্রাণিত করেছে। নূরে শেফা বলেন, সব পেশাতেই চ্যালেঞ্জ আছে। চ্যালেঞ্জ নিয়ে মানুষের পাশে থাকা, মানুষকে সেবা দেয়ার মধ্যে যে আনন্দ আছে, প্রাপ্তি আছে তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। ট্রাফিক বিভাগের পুরুষ সহকর্মীদের সহযোগিতা, পরামর্শ তাকে সাহস জোগায়।
ট্রাফিক বিভাগের পুলিশ পরিদর্শক নূর আলম সিদ্দিক বলেন, আমরা সবাই তাকে নারী নয়, মানুষ এবং সহকর্মীর দৃষ্টিতে দেখি। অন্যদের চেয়ে কোনো অংশেই তিনি কম দায়িত্ব পালন করেন না। সংসারের দায়িত্ব পালনের পর সড়ক-মহাসড়কে দৌড়ে বেড়ানোর মতো দায়িত্ব পালন দুঃসাহসিক।
এভাবে দীর্ঘক্ষণ সড়কে দাড়িয়ে থাকার কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকিও থাকে বলে জানান গাইবান্ধা জেলা বিএমএর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. শাহিনুল ইসলাম মণ্ডল। তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় দাড়িয়ে থাকার কারণে পা ও পায়ের রগ ফোলা এমনকি লেগ ইডিমা রোগের ঝুঁকিও থাকে।
ট্রাফিক সার্জেন্ট নূরে শেফা ১৯৯২ সালে রংপুরের পীরগঞ্জের ফতেহপুরে কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বাজিতপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক, লালদিঘী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক, পীরগঞ্জ মহিলা ডিগ্রি কলেজ ও কারমাইকেল কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিকের পাঠ শেষ করেন। তার স্বামী ঢাকায় ফলিত পুষ্টি গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে কর্মরত। সুত্র: সময় নিউজ।