মাননীয় সংসদ সদস্য শুনতে কি পান

মাননীয় সংসদ সদস্য শুনতে কি পান

হেদায়েতুল ইসলাম বাবু: 
এপাশ-ওপাশ করে রাত কাটছে। চোখ বন্ধ করলেই হযরত, আবির আর রিফাত সামনে এসে দাঁড়ায়। 
ওদের নিথর দেহ ঘুমোতে দেয় না। কানে ভেসে আসে নাড়ী ছেড়া বুকেরধনহারা মায়েদের আহাজারী। 
মাননীয় সংসদ সদস্য, সন্তানদের বুকে জড়িয়ে বাবা হিসেবে নিশ্চয়ই স্বর্গ সুখে আছেন। সন্তানদের সাথে সুখ-দু:খ ভাগাভাগি করে ফ্ল্যাটে শুয়ে ঘুমের দেশে স্বপ্ন সাজাচ্ছেন নিশ্চয়ই। 
হযরত, আবির, রিফাতের বাবা-মায়ের খবর নিয়েছেন কখনো? শত খবরের ভীড়ে ওরা হয়তো চাপা পড়ে গেছে। আপনার উন্নয়নের বরাদ্দে খরচা খাতায় লিখেছে হযরত, আবির আর রিফাতের নাম।  সেই খবর নেয়ার সময় হয়তো আপনার নেই। 
কিন্তু সন্তানহারা বাবা-মায়ের বুকে কষ্টের যে তুফান বইছে তা হয়তো আপনার কান পর্যন্ত পৌছায় না। 
শুক্রবার (১৯ মার্চ) বিকেলের কথা, আপনার সংসদীয় আসন সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বেলকা ইউনিয়নের কিশামত সদর গ্রামের ঘটনা। 
বাবা শফিকুল সন্তানদের দুমুঠো ভাতের যোগার করতে বাড়ি ছেড়েছিলেন। দুই সন্তান হযরত (৭) আর আবিরকে (৩) নিয়ে মা আলেয়া এসেছিলেন সুন্দরগঞ্জের বেলকা ইউনিয়নের কিশামত সদর গ্রামের বাবার বাড়িতে। ওইদিন দুপুরে শিশু হযরত ও আবির তাদের মামাতো ভাই এবং রিফাত মিয়া (৫) সহ বাড়ির বাইরে বেড়াতে যায়। ওরা আর মায়ের কোলে ফিরে আসেনি। সন্ধ্যায় যখন ফিরলো ততক্ষনে আর তাদের দেহে প্রাণ ছিলোনা। 
ওদের মৃত্যুটা বড়ই মর্মান্তিক, বড়ই বেদনাদায়ক মাননীয় সংসদ সদস্য। ওদের জায়গায় একটিবার নিজের সন্তানকে ভেবে দেখুন। আপনার সন্তানের এমন মৃত্যু কি আপনি মেনে নিতে পারতেন, প্রিয় সংসদ সদস্য। 
উপজেলা পরিষদ থেকে কিশামত সদরে ৫ লাখ টাকা ব্যয়ে দুই কিলোমিটার সড়ক হয়েছে। কাবিটা প্রকল্পের এই সড়কে শ্রমিকের বদলে মাটি কাটা হয়েছে ভেকু দিয়ে। সড়কের উভয় পাশে সৃষ্টি হয় এক মানুষ, দেড় মানুষ করে গর্ত। খেলতে গিয়ে সেই গর্তে পড়েই প্রাণ হারায় হযরত, আবির আর রিফাত। মাননীয় সংসদ সদস্য, একটিবার চোখ বন্ধ করবেন প্লিজ। হযরত, আবির আর রিফাত কত কষ্ট পেয়ে মরেছে অনুমান করতে পারছেন হয়তো। 
আপনার উপজেলার বড় বড় কর্তাবাবুরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন, এটি একটি দূর্ঘটনা বলে নিহতদের গরীব পরিবারকে সামান্য আর্থিক সহায়তা দিয়ে দায় সেরেছেন। 
মাননীয় সংসদ সদস্য, মহান জাতীয় সংসদে আপনার বক্তব্য মুগ্ধ হয়ে শুনি, টিভি রেডিওতে আপনার যুক্তিসংগত বক্তব্যের ভক্তদের আমিও একজন। সুন্দরগঞ্জকে স্বপ্নের মতো করে সাজাতে আপনার মুখে অনেক পরিকল্পনার গল্প শুনেছি। উন্নয়নের সড়কের তলে চাপা পড়ে যদি হযরত, আবির, রিফাতদের মরতে হয়, তাহলে আপনার উন্নয়নের সড়কে হাটবে কে, মাননীয় সংসদ সদস্য। 
ওদের মৃত্যুর পর একটি তদন্ত কমিটি হয়েছে, প্রতিবেদন কবে আলোর মুখ দেখবে জানিনা, থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে, মামলাটিরও অপমৃত্যু হবে কি না জানিনা। 
এই ঘটনার সাথে স্থানীয় ইউপি সদস্য, চেয়ারম্যান, উপজেলা চেয়ারম্যান, পিআইও, ইউএনও কার কতটুকু দায় তাও অজানাই থাকলো। 
গরীবের তিন সন্তানের মৃত্যুর পর, গর্তগুলো ভরাট করা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের মধ্যে দায়িত্বহীনতার যে গভীর গর্ত তৈরি হয়ে আছে, সেই গর্ত কবে পুরণ হবে মাননীয় সংসদ সদস্য, বলতে পারেন। 
আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন করছি, জাতীর জনকের জন্মশতবার্ষিকী পালন করছি, কিন্তু একটিবার আপনার কাছে জানতে চাই, হাজারো মা-বোন, লাখো ভাইয়ের রক্তে কেনা স্বাধীন এই দেশের মাটিতে জাতীর জনক বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলায় কবে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। কবে শুনবো অফিসার বাবুরা, জনপ্রতিনিধি নামের মোটা চামড়ার মানুষগুলো, দায়িত্বহীনতার জন্য ক্ষমা চেয়েছে কিংবা বিচারের কাঠগড়ায় দাড়িয়েছে। 
মাননীয় সংসদ সদস্য আপনি অনেক অভিজ্ঞ, আপনাকে জ্ঞান দেবার ধৃষ্টতা আমার নেই, হযরত, আবির, রিফাতের মতো অভাগাদের অভিশাপ তিল তিল করে জমতে জমতে যেদিন বিস্ফোরন ঘটবে, সেদিন হয়তো আমাদের ক্ষমতার দাম্ভিকতা, অহঙ্কার সবই ধুলিকনার সাথে মিশে গিয়ে আমরা অস্তিত্বহীন হয়ে পড়বো- এতোটুকুতো বলতেই পারি মাননীয় সংসদ সদস্য। 
লেখক: রিপোর্টার, সময় টেলিভিশন।