তালেবানের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে তুলে নিচ্ছে আফগানরা

তালেবানের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে তুলে নিচ্ছে আফগানরা

আর্ন্তজাতিক ডেস্কঃ আফগানিস্তানের পার্লামেন্টের উত্তরাঞ্চলীয় প্রদেশ পারওয়ান থেকে নির্বাচিত সদস্য জহির সালাঙ্গি কিছু সময় ঘুমিয়ে নেওয়ার জন্য কুশন ঠিক করছিলেন। এমন সময় তার ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িকে বানানো ঘাঁটিতে গুলির শব্দ শোনা যায়।

তালেবানের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য প্রায় দুই ডজন স্বেচ্ছাসেবীকে নির্দেশ দিতে বসা অবস্থায় গত সপ্তাহে তিনি আল জাজিরাকে বলেন, চারদিন ধরে আমি ঘুমাইনি।

স্বেচ্ছাসেবকরা জানায়, তালেবান যোদ্ধারা নিয়মিত পাহাড় ঘেরা উপত্যকা থেকে তাদের ওপর গুলি চালায়।

সালাঙ্গি উঠে দাঁড়াতেই এক যোদ্ধা ওয়াকি-টকিতে চিৎকার করতে শুরু করেন। এক রুম আরেক রুমে যাওয়ার পথে তার বুটের নিচে আগের বন্দুকযুদ্ধে ভেঙে পড়া কাঁচের টুকরো শব্দ করছিল।

পাহাড় থেকে গুলির শব্দে প্রতিধ্বনি হওয়ার মধ্যেই তিনি বলেন, জবাব দাও! গুলি বন্ধ করো না! কোনও পাল্টা গুলি ছাড়া তাদের এমনটি করতে দিও না।

১১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে মার্কিন ও ন্যাটো সেনা আফগানিস্তান ছেড়ে যাওয়ার সময়সীমা নির্ধারিত হওয়ার পর গত কয়েক সপ্তাহ অন্তত ৫০০ বেসামরিক নাগরিক অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছেন।

মিলিশিয়া কমান্ডার হাজি গোলাম ফারুক মিলিশিয়া কমান্ডার হাজি গোলাম ফারুক

সোমবার লোগার প্রদেশের গভর্নর আব্দুল কাইয়ুম রাহিমি কয়েকশ’ মানুষকে জড়ো করেন। তারা অস্ত্র ও পতাকা নিয়ে প্রাদেশিক রাজধানী পল-ই-আলম-এ জড়ো হয়।

এই বছরের শুরু থেকেই তালেবানবিরোধী স্বেচ্ছাসেবকরা লোগারে আসতে শুরু করে। রাহিমি জানান, গত কয়েক সপ্তাহে কয়েকশ মানুষ তার বাহিনীতে যোগ দিতে চেয়েছেন। সোমবারের সমাবেশ ছিল পরিকল্পিত, শক্তির প্রদর্শন।

তিনি বলেন, মানুষ জানে পরিস্থিতির ভয়াবহতা এবং তারা তালেবানকে দেখাতে চায় কেউ সহযোগিতার জন্য না থাকলেও লোগারের মানুষ এবং প্রদেশের সবাই নিজেরাই সরাসরি তাদের সঙ্গে লড়াই করবে।

কাউকে রেহাই দিচ্ছে না তালেবান

কাবুলের উত্তর দিকে ১২০ কিলোমিটার দূরে গোরবান্দ উপত্যকায় পারওয়ান জেলা সবচেয়ে অরক্ষিত এলাকাগুলোর একটি। স্বেচ্ছাসেবকরা জানান, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো স্থানীয়দের রক্ষায় তালেবানের বিরুদ্ধে তাদের অস্ত্র হাতে তুলে নিতে বাধ্য করেছে।

সম্প্রতি পারওয়ানসহ বিভিন্ন জেলার দখল নিয়েছে তালেবান। এসব জেলার বেশিরভাগ কয়েকদিনের মধ্যে আফগান বাহিনী পুনরুদ্ধার করেছে।

কিন্তু সালাং জেলা থেকে আসা এসব স্বেচ্ছাসেবীরা জানান, তালেবান যা করছে বলে শুনছেন তা ভয়াবহ। দুই সপ্তাহ আগে গোরবান্দে আসা ৫০ বছর বয়সী দাউদ নামের স্বেচ্ছাসেবী বলেন, তালেবান সরাসরি বাড়িতে গুলি করছে। ঘর, ক্ষেত ও দোকান জ্বালিয়ে দিচ্ছে। তারা কাউকে ও কোনও কিছুকে রেহাই দিচ্ছে না।

নিজের এই দাবির সপক্ষে দাউদ তালেবান যোদ্ধা ও আফগান বাহিনীর দুটি সংঘর্ষের কথা তুলে ধরেন। তার কথায়, আমরা তালেবানদের মৃতদের ফেরত দেই। তারা তাকে মালা পরিয়ে শহীদ আখ্যা দেয়। কিন্তু আফগান সেনাদের প্রতি একই ধরনের শ্রদ্ধা দেখানো হয়নি।    

তিনি আরও বলেন, কয়েক দিন আগে তালেবানের মাইনে কয়েক জন আফগান সেনা নিহত হয়। আমরা নিহত সেনাদের দেহাবশেষ ফেরত চেয়েছিলাম। তারা প্রত্যাখ্যান করে।

আফগান ন্যাশনাল আর্মিআফগান ন্যাশনাল আর্মি

সালাঙ্গির মতো রাজনীতিক ও কাবুলের কর্মকর্তারা আফগান নিরাপত্তাবাহিনী ও যোদ্ধা গোষ্ঠীর গুলোর মধ্যে বিশৃঙ্খলার আতঙ্ক দূর করার চেষ্টা করছে। কাবুলের এক আইনপ্রণেতা খান আগা রাজায়ি উত্তরাঞ্চলীয় প্রদেশে অস্ত্র হাতে তুলে নেওয়া স্বেচ্ছাসেবীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। তার মতে, সরকারি বাহিনীর সঙ্গে এসব গোষ্ঠীর এক সঙ্গে কাজ করা অস্বাভাবিক কিছু না।

খান আগা বলেন, যখন ওই এলাকায় যাবে দেখা যাবে স্বেচ্ছাসেবীরা সেনাবাহিনী ও পুলিশকে তাদের অভিযানে সহযোগিতা করছে।

আফগান সেনা আমির আমিরি স্বেচ্ছাসেবী বাহিনীর দায়িত্ব পালনের প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন, কোনও মজুরি ছাড়াই নিজেদের মাতৃভূমি রক্ষার তারা নিজের জীবনের ঝুঁকি নিচ্ছেন।

পাশে ৬০ বছরের সাদা দাড়িওয়াল একজনকে দেখিয়ে আমিরি বলেন, তাকে দেখুন। তিনি অনেক বয়স্ক এবং শত্রুর বিরুদ্ধে দেশকে রক্ষায় লড়াই করতে রাজি।

সালাঙ্গির প্রশংসায় যুক্ত হয়েছে আফগান বাহিনীও। তিনি বলেন, মানুষ পরিবার ছেড়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাদের লড়াইয়ে সহযোগিতা করছে দেখে সেনাদের মনোবল বাড়ে।

সোমবার লোগার প্রদেশের গভর্নর আব্দুল কাইয়ুম রাহিমি কয়েকশ’ মানুষকে জড়ো করেনসোমবার লোগার প্রদেশের গভর্নর আব্দুল কাইয়ুম রাহিমি কয়েকশ’ মানুষকে জড়ো করেন

আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ফাওয়াদ আমান জানান, আফগানিস্তানের মানুষেরা নিরাপত্তাবাহিনীর সঙ্গে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করতে রাজি আছে। যখন তারা দেখছে তালেবান ও তাদের রীতিনীতি আফগান জনগণের বিরুদ্ধে কতটা বিদ্বেষমূলক ও ন্যাক্কারজনক।

তিনি আরও বলেন, সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাবাহিনীর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করতে চায় কারণ বাহিনীর সদস্যরা সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ করতে প্রস্তুত তালেবানের অপবিত্র যুদ্ধের বিরুদ্ধে।

অনেক আফগান মনে করছেন, সম্প্রতি প্রায় ৩০ হাজার মানুষ দেশের বিভিন্ন স্থানে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছে। তবে অনেকেই দেশটির এত মানুষের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।

তবে সালাঙ্গি ও রাজায়ি বলছেন, স্বেচ্ছাসেবক গোষ্ঠীগুলোকে মানুষের ভয় পাওয়া উচিত না। রাজায়ির মতে, এই মানুষরা যা তাদের তা রক্ষা করছেন। সূত্র: আল জাজিরা