অযত্ন অবহেলায় ধ্বংস হচ্ছে নলডাঙ্গার জমিদার বাড়ি

অযত্ন অবহেলায় ধ্বংস হচ্ছে নলডাঙ্গার জমিদার বাড়ি

তোফায়েল হোসেন জাকির: প্রখ্যাত নাট্যকার-গীতিকার ব্যক্তি তুলসী লাহিড়ী। এক জমিদার পরিবারে জন্ম তাঁর। তিনিও নিজ বাড়ি থেকে জমিদারি কার্যক্রম তদারকি করতেন। কিন্ত চিরচেনা এই জমিদার বাড়িটি এখন ধ্বংশের দ্বারপ্রান্তে। তবে দাদার স্মৃতিগুলো আঁকড়ে ধরে রাখার চেষ্টা করছে তুলসী লাহিড়ীর একমাত্র নাতি তন্ময় চন্দ্র। 

ইতিহাস-ঐতিহ্যের ওই জমিদার বাড়িটি গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার নলডাঙ্গা ইউনিয়নের দশলিয়া গ্রামে। অযত্নে অবহলোয় আজও দাঁড়িয়ে রয়েছে কালের স্বাক্ষী হয়ে। জরার্জীর্ণ এই বাড়ির তেমন কোন সৌন্দর্য্য না থাকলেও, তবুও এক নজর দেখতে ছুটে আসেন ভ্রমণ পিপাসুরা। 

সরেজমিনে জানা যায়, ওই গ্রামের স্বর্গীয় সুরেন্দ চন্দ্র ও শৈলবালা দম্পতির কোন মেয়ে সন্তান নেই। ছিল ৪ জন ছেলে। তারা হলেন, স্বর্গীয় তুলসী লাহিড়ী, গোপাল চন্দ্র, ধীরেন্দ্র চন্দ্র ও বীজন চন্দ্র। এর মধ্যে সবার বড় ছেলে তুলসী লাহিড়ীর জন্ম হয় ১৮৯৭ সালে। তৎকালিন জমিদার বংশে বড় হওয়া তুলসী লাহিড়ীর বৈবাহিক জীবনে ৪ ছেলে সন্তানের জনক ছিলেন। তাঁর ছেলেরা হলেন স্বর্গীয় হরেন্দ্র চন্দ্র, গোবিন্দ চন্দ্র, মতিলাল চন্দ্র ও দিনান চন্দ্র। এসব ছেলের মধ্যে শুধু মাত্র হরেন্দ্র চন্দ্র  বিয়ের সাধ  গ্রহনন করলেও অন্য তিন ছেলে করছিলেন না বিয়েস্বাধী। 
  
জীবদ্দশায় তুলসী লাহিড়ী তাঁর নিজস্ব শিক্ষাদীক্ষা, পারিবারিক সংস্কৃতি, তাঁর আইনজ্ঞান, রংপুরে সেই সময়কার নাট্যসংস্কৃতি, জমিদারের ছেলে হয়েও কৃষিজীবন ও সংস্কৃতি সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও পঞ্চাশের মন্বন্তরের রূঢ় অভিঘাত এবং সর্বোপরি মূল্যবোধে দৃঢ়বিশ্বাস তাঁর শিল্পী মানসকে প্রভাবিত করেছিল।

নলডাঙ্গার দশলিয়ার এ জমিদার বাড়িতে একসময় নাটকও মঞ্চস্থ হতো। এখানে বসেই বহুমাত্রিক শিল্প প্রতিভার অধিকারী তুলসি লাহিড়ী সাংস্কৃতিক জগতের নানা কাজ করতেন। তাঁর অভিনীত  
প্রথম নাটক 'কর্ণার্জুন'। এছাড়া তিনি মিশোর কুমারী, কিন্নরীসহ অনেক নাটকে অভিনয় করেছেন। মণিকাঞ্চন ও রিক্তা ছায়াছবির চিত্রনাট্যও তিনি রচনা করেছেন। অর্ধশতাধিক ছায়াছবিতে অভিনয় করেছেন। তিনি ছিলেন একাধারে মঞ্চ অভিনেতা, চিত্রাভিনেতা, নাট্যকার, সুরকার, সঙ্গীত পরিচালক, চিত্র নাট্যকার ও চিত্রপরিচালক। 

১৩৩৪ বঙ্গাব্দে নির্মিত শ্রীশ্রী শৈলেশ্বর মন্দিরের শিলালিপি থেকে নলডাঙ্গার দশলিয়া জমিদার বংশের পূর্বপুরুষ সুরেন্দ্র দেবশর্মা ও শ্রমিতী শৈলবালা দেবীশর্মার নাম পাওয়া যায়। এ দম্পতির সন্তান তুলসি লাহিড়ী। এ জমিদারবাড়িতে রয়েছে শ্রীশ্রী শৈলেশ্বর মন্দির। ভারতের কাশি থেকে আনা পাথরের তৈরি করা এ মন্দির। জমিদারবাড়ির প্রতœতাত্তি¦ক নিদর্শনগুলোর মধ্যে ১২৮০ সালে তৈরি ভগ্নপ্রায় কষ্টিপাথরের শিবলিঙ্গ ও শ্বেতপাথরের বিষুষ্ণ মন্দির রয়েছে। এ ছাড়াদুর্ভিক্ষ কবলিত জমিদারদের দ্বারা খননকৃত ৫ একর ১৭ শতাংশ আয়তন বিশিষ্ট বিরাট আকারের পুকুর। বর্তমানকাল পর্যন্ত বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাত্যহিক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। এখানে থেকেই লালমনিরহাটের হাতিবান্ধা, ডাউয়াবাড়ি, বগুড়ার শেরপুর ও পশ্চিম দিনাজপুরের বিভিন্ন অঞ্চলের জমিদারি কার্যক্রম তদারকি করতেন তুলসি লাহিড়ী। তুলসি লাহিড়ী ৬২ বছর বয়সে ১৯৫৯ সালে কলকাতায় পরলোকগমন করেন।

যেভাবে যাওয়া যাবে এ বাড়িতে-
গাইবান্ধা জেলা শহর থেকে যেকোনো ট্রেনে (আন্তঃনগর ছাড়া) সরাসরি নলডাঙ্গা রেলস্টেশনে নেমে যাওয়া যায় এই জমিদার বাড়িতে। যা স্টেশনের পশ্চিম দিকে অবস্থিত। অথবা গাইবান্ধা খানকাহ্ শরিফ থেকে সড়ক পথে গাইবান্ধা-সাদুল্লাপুর-নলডাঙ্গা। এছাড়া সড়ক পথে গাইবান্ধা-লক্ষ্মীপুর-ধোপাডাঙ্গা নতুনবাজার-নলডাঙ্গা সড়ক, সুন্দরগঞ্জ-বামনডাঙ্গা-নলডাঙ্গা সড়ক দিয়েও যাওয়া যায়।  

বর্তমানে জমিদার বাড়িটি এক নজর দেখার জন্য বিভিন্ন এলাকার মানুষেরা ছুটে আসেন এখানে। ভ্রমণ করতে আসা এসব দর্শনার্থীরা জমিদারের জিনিসপত্র গুলো ঘুরে ঢ়ুরে দেখেন। তবে অনেকে বিমুখ হচ্ছেন এ বাড়ি থেকে। আবার অনেকে ক্ষোভ প্রকাশও করে থাকেন। কারণ, উপমহাদেশের বিখ্যাত ব্যক্তির এ বাড়িটি ঝোঁপ-জঙ্গলে আবদ্ধ করে রাখছে। যেন নেই কোন পরিবেশ। ধ্বংশের দ্বারপ্রান্তে জমিদার বাড়িতে প্রবেশ পথে কোন ধরণের গেইট নির্মাণ করাও হয়নি। সেই সঙ্গে এ বাড়িতে চলে স্থানীয় মাদকসেবীর আড্ডা। তারা জঙ্গলের আড়ালে বসে অবাধে সেবন করছে বিভিন্ন মাদক। এমনি যদি চলতে থাকে তাহলে অল্পদিনের মধ্যে জমিদার বাড়িটি বিলুপ্তি ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বর্তমানে ইতিহাস-ঐতিহ্যের এই জমিদার বাড়িতে থাকেন তুলসী লাহিড়ীর একমাত্র নাতি তন্ময় চন্দ্র ও তার স্ত্রী শিলারাণী, ছেলে তৌসিক, তুসার ও মেয়ে সুনান্দরাণী। এখন এ পরিবারটি তুলসী লাহিড়ীর বসত ঘরটিসহ মন্দির, কুয়া অন্যান্য স্মৃতিগুলো কৃত্রিম উপায়ে ধরে রাখার চেষ্টা করছে।   

বাড়িটি দেখতে আসা শিক্ষার্থী রফিকুল ইসলাম জানান, বিসিএস পরীক্ষায় এই জমিদার বাড়ি নিয়ে প্রশ্নমালা তৈরী হয়েছিল। এমন প্রশ্ন ইতিহাস থেকে জানা থাকা স্বর্তেও সেটি স্বচোখে দেখতে আসতে হয়েছে। প্রখ্যাত নাট্যকার ও জমিদারের এ বাড়ি এখন বিলিন হতে চলছে। সরকারি পৃষ্টপোষকতা ছাড়া জমিদারের স্মৃতি-চিহ্ন ধরে রাখা সম্ভব না। 

প্রখ্যাত তুলসি লাহিড়ীর নাতি তন্ময় চন্দ্র বলেন, দেশের বেশ কিছু জমিদার বাড়িগুলো সরকারি সহায়তা দৃষ্টিনন্দন করে গড়ে তোলা হয়েছে। কিন্ত দাদার এ বাড়ি আহও অবহেলিত হয়ে দাঁড়িয়ে। তবুও নিজের চেষ্টায় সংস্কার করার চেষ্টা করা হচ্ছে। 

তিনি আক্ষেপ করে আরও বলেন, দেশ স্বাধীনের পর থেকে দাদা তুলসী লাহিড়ীর স্মরণে কোন রাস্তা, প্রতিষ্ঠান কিংবা গেইট নামকরণ করা হয়নি। এসব বিষয়ে সরকারের নিকট দাবি জানাচ্ছি।