শিক্ষার দরজা খুলে দাও

শিক্ষার দরজা খুলে দাও

রোকনুজ্জামান রোকনঃ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা ও পরীক্ষা নেয়ার বিষয়ে আসছে নতুন ঘোষণা-- এমন খবর ফেইসবুকের নিউজ ফিডে নোটিফিকেশন হয়ে হরহামেশাই আসছে। এবং সেসব আসছেও একদল লাইক-কামানো নিউজ পোর্টাল থেকে। তারসাথে যুক্ত হয়েছে মেইনস্ট্রিম ধারার মিডিয়াও। কেননা লাখ লাখ শিক্ষার্থীরদের আকাঙ্খিত খবরটাকে পুঁজি করে হাল আমলের ভিউ বাড়ানোর কায়দা-কৌশলে তারাও পিছিয়ে থাকতে চাইবে কেন। তাদের ভিউ বাড়লো, বাড়লো আয়ও। কিন্তু এসব খবরে ক্লিক করতে করতে আঙ্গুল ব্যথা হয়ে যাওয়া ক্লান্ত সেই শিক্ষার্থীদের খবর কেউ রাখলোনা! বারেবারে নতুন ক্লিকে সেই পুরাতন খবর, নাতিদীর্ঘ সংবাদে আসলে কি সিদ্ধান্ত হয়েছে বোঝা গেলো না! যথাযথ কর্তৃপক্ষের সূত্র নাই। যার সারবস্তু হলো, শীঘ্রই সিদ্ধান্ত হবে! এ খবরে হাসা না দুঃখ করা উচিত সেটা নির্ধারণ করা মুশকিল! নির্ধারণ না করা গেলেও হতাশা বাড়ে এরম খবরে সেটা সহজেই অনুমেয়। এমাস ওমাস করতে করতে এখন বহুমাস, ছুটির হিসেব দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর। খবরগুলো এলোমেলো হলেও একটা খবর কিন্তু পাক্কা সেটা হলো 'শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ'। উল্টা পাল্টা, গোলমেলে কাজ করার জন্য চতুর্দশ শতাব্দীর সুলতান মুহম্মদ বিন তুঘলক(১ম) ও মুহাম্মদ ফিরোজ শাহের(২য়) শাসনকাল তুঘলকি শাসনামল বলে খ্যাত। এখন তুঘলকি শব্দটার মানে ও গুনাগুন আমাদের মুখস্ত। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা নিয়ে তুঘলকি আমল ফিরে এসেছে ! হঠাৎ একদিন ঘুম থেকে উঠে দাঁত মাজতে মাজতে কর্তা ব্যক্তিদের মনে হলো বহুদিন ছাত্র ছাত্রীদের পরীক্ষা নেয়া হয়না আজ থেকে নিতে হবে। নোটিশ দেয়া হলো, পরীক্ষা নেয়া শুরু হলো! দুদিন পর হঠাৎ মনে হলো না এখন পরীক্ষা নেবো না। ব্যস পরীক্ষা বন্ধ! কর্তাদের মন মর্জির উপর সব নির্ভর করবে! নিয়ম- কানুন কিংবা দায় দায়িত্বের ব্যাপার নয়! তুঘলকি পাগলা রাজাদের মতো! কিন্তু দাঁত মাজতে মাজতে নেয়া সিদ্ধান্তের ফলাফল হিসেবে চরম দুর্দশা ও আর্থিক কষ্টে শিক্ষার্থীরা বেহুশ হলেও হুশ হয়নি কর্তাদের ! আবাসিক হল বন্ধ, দ্রুত মেস খুজে ভাড়া করা এবং তার জন্য টাকার জোগাড় করা এ যে কতটা কষ্টের সে ভুক্তভোগী ছাড়া অন্যরা বুঝবে না। আবার কয়েকদিন পর মেস ছেড়ে দেয়া, এটা মরার খাড়ার ঘা। কতটা কাণ্ডজ্ঞানহীন হলে এরম করা যায়! খোলা আবার বন্ধ, কেনো? এরম সুত্রের সমাধান নেই এদেশে! বিপদ কতবড় হলে হলের মাঠে হলে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটায়, হলের তালা ভেঙে ভিতরে ঢোকে!ঢাবি, ববি,জাবি, রাবি, ইবি ও শাবিপ্রবিতে আন্দোলন চলছে। কেউবা সময় বেঁধে দিয়েছে, কেউবা রাস্তায়, কেউবা হলে তালা ভেঙে অবস্থান নিয়েছে। দাবি করছে প্রতিষ্ঠান ও হল খুলে দেবার। জটে পড়া পরীক্ষাগুলো নেবার। করোনায় আটকে পড়া জটে বয়স শেষ হচ্ছে কিন্তু শত দাবি করার পরও চাকুরির বয়সসীমা বাড়ানো হচ্ছে না। তাহলে ভবিষ্যৎ কি দাঁড়াবে লাখ লাখ শিক্ষার্থীর! আন্দোলনের মুখে সর্বশেষ এখন তারা বলছে ঈদের পর অর্থাৎ ১৭ মে আবাসিক হল, ২৩ মে বিশ্ববিদ্যালয় খুলে ২৪ মে ক্লাস শুরু করবে। অদ্ভুতূরে সব কান্ড! এরা আসলে সুনির্দিষ্ট এবং ঐকান্তিক নয়। সেটা হলে ২৭ জানুয়ারি করোনার গণটিকা শুরু হবার পর ১৩ দিনে ২৩ লাখ মানুষ টিকা নিয়েছে। পরিকল্পনা থাকলে দেশের ৪৬ টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কথাই যদি ধরি তাহলে ২২০ টি আবাসিক হলে ১ লাখ ২৯ হাজার ৪৩৩ জনকে টিকার আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব ছিলো। পর্যায়ক্রমে অন্যদের। আসলে মে মাসে খোলার কথা বলছেও কোন পরিকল্পনা ছাড়াই, ছাত্রদের ক্ষোভ প্রশমিত করতে। ছাত্ররা এসব মানবে কেন? কথায় কাজ হবে না সেটা ভালো করে ছাত্ররা জানে। যেহুতু আন্দোলনই একমাত্র পথ দাবি আদায়ের তাই তারা আন্দোলন করছে। আন্দোলন করে দাবি আদায় হয় এদেশে ছাত্ররা অতীতে বারবার দেখছে। ঢাকার সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে গতকাল স্থগিত করা পরীক্ষা পুনরায় নেবার ঘোষণা দেয়া তার প্রকৃষ্ট আরেকটি প্রমাণ । গার্মেন্টস, হাটবাজার, সভা-সমাবেশে, ওয়াজ- মাহফিল, আবাসিক কওমি-হাফেজিয়া মাদ্রাসা, লঞ্চ-স্টিমার চলাচল, ফেরিঘাট, বাস-ট্রেন, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, আদালত সবই তো খোলা। বন্ধ শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। যেন সব করোনা চারপাশের চাপে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে আশ্রয় নেবে ! কিয়্যাক্টাবস্থা! দেশে চরম অগণতান্ত্রিক শাসনব্যস্থা চলছে। পাটকল-চিনিকল বন্ধ করছে। বাক স্বাধীনতা হরণ করে তালা ঝুলিয়েছে সবক্ষেত্রেই। এযেন সত্যজিত রায়ের, 'হীরক রাজার দেশ' সিনেমার গপ্পো। পাঠশালা বন্ধ৷ রাজার হুকুমে পণ্ডিত মশাইয়ের ঘরবাড়ি, বইপত্র সব জ্বালিয়ে দেওয়া হয়৷ রাজার স্তুতি, “লেখাপড়া করে যে, অনাহারে মরে সে”, “জানার কোনও শেষ নাই, জানার চেষ্টা বৃথা তাই”। নিজেকে ভগবানের আসনে বসানো রাজা জানেন, “ওরা যত বেশি পড়ে, যত বেশি জানে, তত কম মানে।” রাজ্যের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে যন্তর-মন্তর ঘরে ঢুকিয়ে যন্ত্রবত করে তুলে সকলকে মুখস্ত করাতে চায়, " যায় যদি যাক প্রাণ, হীরকের রাজা ভগবান"। শেষতক স্কুল বন্ধ থাকেনি, মানুষগুলো আবার মানুষ হয়ে উঠেছে সিনেমায়, তালা বন্ধ করে রাখা যায়নি কাউকেই, মুক্তির স্বাদ নিয়েছে রাজ্যের মানুষ। রাজা খান খান হয়েছে! সদ্য প্রয়াত সৈয়দ আবুল মকসুদ আদমজী জুটমিল বন্ধের প্রতিবাদে প্রতিকি তালা নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়েছিলেন, যার গায়ে লেখা ছিলো "আদমজীসহ বন্ধ পাটকলগুলোর তালা খুলে দিন"। আজও পাটকল বন্ধ হয়, বন্ধ হয় কাজ হারানো শ্রমিকের দম! আসলে এতো এতো অন্যায় এরা প্রতিদিন করছে সেজন্য ছাত্রদের ভয় পাচ্ছে। ভয়কে জয় করার জন্যই মোকাবেলা করার সময় নিচ্ছে। সেটার প্রস্তুতি হিসেবে বহিষ্কার করলো অনেক ছাত্রদের। তাতে কাজের কাজ কিন্তু কিছুই হয়নি! আজ ছাত্ররা তাদের নিজস্ব দাবি নিয়ে আন্দোলনে নামলেও একদিন সামগ্রিক মুক্তির আন্দোলনে নামবে কিংবা নামতে হবে। কারণ তার সামনে সকল দুয়ারই তো তালা বদ্ধ। যেকোন গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সম্পন্ন মানুষের এ অচলাবস্থা নিরসনের আন্দোলনে পাশে দাঁড়ানো ও সমর্থন করা প্রয়োজন। কর্তৃপক্ষ দাবি না মানলে সামনে আন্দোলন জোরদার হবে এবং হওয়াটা উচিৎ। এতো অনিয়ম, অবিচার তো চলতে পারে না। স্বৈরতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের অবসান হোক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বদ্ধ দুয়ার খুলে যাক, আবাসিক হল গুলো মুখরিত হয়ে উঠুক আবার, প্রাণ ফিরে পাক ক্যাম্পাসগুলো। লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা