১৯৫০ সালেই গাইবান্ধায় রাষ্ট্রভাষার দাবিতে বিক্ষোভ

১৯৫০ সালেই গাইবান্ধায় রাষ্ট্রভাষার দাবিতে বিক্ষোভ

একুশে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২। ভাষার দাবিতে রাজপথে রক্ত ঝরল ছাত্রদের। ভাষার মাসে আমরা শুনব, জেলায় জেলায় উত্তাল আন্দোলনের সেই সব ঘটনা

ভাষা আন্দোলনের আগুন দ্রুতবেগে ঢাকা থেকে জেলা শহর হয়ে গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে পড়ে। সর্বত্রই এর মশালবাহক ছিল ছাত্রসমাজ। আর ছাত্রদের সঙ্গে সহমর্মিতায় পথে নেমে আসে এলাকার সাধারণ মানুষ-পেশাজীবী থেকে শ্রমজীবী মানুষ-কোথাও কৃষক, কোথাও শ্রমিক। বিশেষ করে ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি তথা একুশেতে সূচিত আন্দোলনের এমনটাই ছিল চরিত্র। যেমন উদাহরণ রংপুর জেলার গাইবান্ধা মহকুমা, এর ফুলছড়ির মতো একাধিক থানা এবং গোটা প্রদেশের এমনই জেলা শহর, মহকুমা শহর, নিস্তরঙ্গ থানা শহর থেকে ইউনিয়ন হয়ে গ্রামের স্কুল পর্যন্ত আন্দোলনের স্পর্শে উত্তেজক চরিত্র অর্জন করে।

তাই গাইবান্ধায় একুশে বলতে শুধু সেই শহরই নয়, গোটা অঞ্চলকেই বোঝা যায়। এখনো ভাবি-কী জাদুতে ১৯৫২-র ফেব্রুয়ারিতে ভাষার দাবি নিয়ে এমন সচেতনতা তৈরি হয়েছিল ছাত্রসমাজে, এর প্রভাব সঞ্চারিত হয় জনমনে। নিয়মমাফিক ১৯৪৮ সালের মার্চের ভাষা আন্দোলন উত্তরবঙ্গের প্রান্তিক শহর গাইবান্ধাকে ততটা স্পর্শ না করলেও সে প্রভাবে পরের বছর রাষ্ট্রভাষা বাংলার সমর্থনে বিচ্ছিন্নভাবে প্রতিবাদী সভা-সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ এ বিক্ষোভে শামিল হন সম্ভবত ভাষিক আবেগের তাগিদে।
১৯৫০ সালে সরকার প্রণীত মূলনীতি কমিটির সিদ্ধান্তের কল্যাণে ঢাকা শহরের মতো প্রদেশের বিভিন্ন শহরে সীমাবদ্ধ পরিসরে ভাষিক তত্পরতা লক্ষ করা যায়। গাইবান্ধাও ব্যতিক্রম ছিল না। এখানে ১৯৫০ সালে গাইবান্ধা হাইস্কুল ও একাধিক শিক্ষায়তনের ছাত্রদের মিলিত প্রচেষ্টায় প্রতিবাদী বিক্ষোভ দেখা দেয় রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে। এ পর্যায়ে সাধারণ মানুষের সমর্থন ততটা না হলেও বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ও শ্রমজীবী মানুষের সংশ্লিষ্টতা ছিল লক্ষ করার মতো। যেমন কৃষক সমিতি, বিড়ি শ্রমিক ইউনিয়ন ইত্যাদি। বাদ যায় না কমিউনিস্ট পার্টিও।

২.
কিন্তু ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারিতে যেমন ঢাকায়, তেমনি দেশের অন্যত্র এর চরিত্রই আলাদা। ছাত্রদের প্রতিবাদী আন্দোলনে দেখা গেল রাজনৈতিক চেতনার প্রকাশ, সঙ্গে শ্রেণি-রাজনীতির কিছুটা প্রভাব। তা ছাড়া ১৯৪৮ পেরিয়ে ১৯৫২ সালে পৌঁছে একাধিক ছাত্রসংগঠন ও শ্রেণি সংগঠনের প্রভাবে একুশে সংহত রূপ ধারণ করে। প্রমাণ ’৫২-তেই গাইবান্ধায় গঠিত সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি। আহ্বায়ক মতিউর রহমান, সম্পাদক হাসান ইমাম টুলু।
কমিটিতে আরও ছিলেন আজিজুর রহমান, কাজী আবদুল হালিম, খান আলী তৈয়ব, শাহ ফজলুর রহমান, কার্জন আলী প্রমুখ। একুশে পরবর্তীকালে গঠিত ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি ছিলেন আলী তৈয়ব এবং সম্পাদক কার্জন আলী। বছর কয়েক আগে গুরুতর অসুস্থ ভাষাসংগ্রামী কার্জন আলীর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ ঘটে বিশেষ কারণে। সে অসুস্থতা থেকেই কিছু সময় পর তাঁর মৃত্যু।

৩.
ঢাকায় ছাত্রজনতার ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণের প্রতিক্রিয়ায় গাইবান্ধায়ও অন্যান্য শহরের মতোই ভাষা আন্দোলনের স্বতঃস্ফূর্ত সূচনা। ২২ ফেব্রুয়ারি পূর্বোক্ত সংগ্রাম কমিটির উদ্যোগে গাইবান্ধা শহরে বিশাল জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। এ উপলক্ষে মিছিল, স্লোগান এবং স্বতঃস্ফূর্ত হরতাল। পুলিশের লাঠিচার্জ উপেক্ষা করে চলে মিছিলের শহর পরিক্রমা।
হরতাল উপলক্ষে শিক্ষায়তন ও দোকানপাট বন্ধ থাকে। যেমনটা দেখা গেছে রাজধানী ঢাকায়। পুলিশ মিছিলে লাঠিচার্জ ছাড়াও আন্দোলন বন্ধ করতে আন্দোলনের নেতাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি ও মামলা রুজু করে। তা ছাড়া মুসলিম লীগ দলের ঐতিহ্যমাফিক তাদের মাস্তান বাহিনীর হামলাও চলে। আন্দোলনে বিশেষভাবে দেখা গেছে ঢাকার তুলনায় শহরগুলোতে আন্দোলনে পুলিশের অধিকতর উপদ্রব।
এ আন্দোলন যেমন শহর গাইবান্ধায় সীমাবদ্ধ না থেকে বাইরে ছড়িয়ে পড়েছিল, তেমনি প্রতিবাদ মিছিলও চলে পরবর্তী কয়েক দিন অব্যাহত তালে। পুলিশের জুলুমবাজিতে নেতৃস্থানীয় কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করার পর অন্যদের আত্মগোপনে থাকতে হয়। এ আন্দোলনের উত্তরপ্রভাবে ১৯৫৩ সাল থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস পালনে জোয়ারি আবেগ সৃষ্টি হয়। এর প্রভাব পড়ে জনমানসে। স্বভাবতই পুলিশ ও সরকারি গুন্ডা হামলার প্রতিক্রিয়ায় ছাত্রজনতার পাল্টা হামলা চলে মুসলিম লীগ অফিসে। এ ছাড়া আন্দোলনের ইতিবাচক উত্তরপ্রভাব পড়ে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে, যুক্তফ্রন্টের পক্ষে তৈরি হয় ব্যাপক জনসমর্থন এবং পরিণামে তাদের বিজয়।
গাইবান্ধায় শহীদ মিনার তৈরির প্রথম উদ্যোগ নেওয়া হয় ১৯৫৫ সালে। সে উদ্যোগ ১৯৫৬ সালে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনে সীমাবদ্ধ থাকে। শেষ পর্যন্ত ছাত্রজনতার চেষ্টায় ১৯৫৭ সালে নির্মিত হয় পূর্ণাঙ্গ শহীদ মিনার। একাত্তরে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী শহীদ মিনার ভেঙে ফেলার পর আবার স্বাধীন বাংলাদেশে নতুন করে শহীদ মিনার নির্মিত হয়। - আহমদ রফিক, প্রথম আলো থেকে সংগৃহিত।