সিরাজগঞ্জের ঐতিহ্য ইংরেজ সাহেবদের ইলিয়ট ব্রীজ-শহরবাসির বড়পুল

সিরাজগঞ্জের ঐতিহ্য ইংরেজ সাহেবদের ইলিয়ট ব্রীজ-শহরবাসির বড়পুল

সিরাজগঞ্জ মহুকুমা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৫৫ সালে। শহরটি এক সময়ের স্রোতসিনী যমুনার তীরে গড়ে উঠে। জমিদার সিরাজ চৌধুরী প্রতিষ্ঠা করেন এই শহর। বার বার নদী ভাংগনে কোল বন্দর আর টান বন্দর দুভাগে বিভক্ত এই শহরের ব্যবসার প্রসারের জন্য ইংরেজ ও মারোয়ারী ব্যবসায়ীদের উদ্বুদ্ধ করেন জমিদার সিরাজ চৌধুরী। শহরে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে প্রয়োজনে বিনামূল্যে নিজের ভুমি দান করেন। ফলশ্রæতিতেবিভিন্ন সময়ে ইংরেজ বেনিয়াদের মেসার্স র‌্যালী ব্রাদার্স এন্ড কোং, ল্যান্ডেল এন্ড ক্লার্ক লিমিটেড, এম. ডেভিড এন্ড কোম্পানী, চিটাগাং এন্ড কোম্পানী, আর. সিম এন্ড কোম্পানীর মতো  ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠে। গড়ে উঠেজ্ঞান চাঁদ, মানিক চাঁদ, টিক চাদ এর মতে মারোয়ারীদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। বর্ষার সময়ে  টান বন্দরে আবারআশ্বিন মাসেহতে পানি শুকিয়ে গেলে কোল বন্দরে ব্যবসা জমজমাট হতো।সিরাজগঞ্জ বন্দরের প্রধান পন্য ছিল পাট এবং পাটের চট ও পাটের তৈরী ছালা।পাট এবং পাটজাত দ্রব্য ছাড়াও ধান, চাউল, মটর, খেসারি বিদেশে রপ্তানি হতো। বিদেশ হতে আমদানী হতো লবণ, কেরোসিন তৈল, করগেট টিন, কাপড় । আমদানী-রপ্তানী যাই হোক না কেন মূলত পাট এবং পাটজাত দ্রব্যই ছিল প্রধান পণ্য।যমুনা তীরঘেষে গড়ে উঠা এই শহরটি ধীরে ধীরে একটি নদী বন্দরে রুপান্তরিত হয়ে ওঠে। এই শহরের বিশাল পাটের কারবার দেখে মি. বেরী নামের এক ইংরেজ ম্যাজিষ্ট্রেট চাকুরি ছেড়ে দিয়ে শহরের মাছিমপুরে প্রতিষ্ঠাকরেন একটি পাটকল। এই পাটকলে তৈরী হতো পাটের চট ও ছালা।লোকে পাটকলটিকে বলতো কলকুঠি নামে। দুই শিফটে পরিচালিত এই মিলে কাজ করতো  ২৮৯০ জন শ্রমিক। এর বাইরেও কাজ করতো অনেক কুলি, ফরিয়া ও পাটের কারবারীরা। ১৮৯৭ সালে ভুমিকম্পে এই পাটকলটি ধ্বংস হয়ে যায়।

 শহরের মাঝ দিয়ে প্রবাহিত কাটাখাল। যমুনা নদী হতে এই কাটাখাল দিয়েই প্রবাহিত হতো পানি। সারা বছরই কাটাখালে পানি থাকতো। এইখালের  দুপাশ জুড়ে গড়ে উঠে বড় বড় পাটের আড়ত। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। ভারত বর্ষের বিভিন্ন স্থান হতে এবং বিখ্যাত ইংরেজ পাট ব্যবসায়ীরা আসতেন সিরাজগঞ্জে। ব্যবসা করতেন। লাভবান হতেন। বলতে গেলে পাট ক্রয় বিক্রয় কেন্দ্র ও পাট ব্যবসা ক্ষেত্রে কোলকাতা ও নারায়নগঞ্জের পরই উপমহাদেশের প্রধান বন্দর হিসাবে গন্য হতো সিরাজগঞ্জ।সে সময়ের সিরাজগঞ্জ শহরের বর্ণনা পরিস্কারভাবে ফুটে ওঠে স্যার ক্যাম্বেল এর ভাষায়। সিরাজগঞ্জ শহর দেখে তিনি  এভাবেই বলেছিলেন- ‘‘ স্টিমারের ডেকের উপর হইতে আরোহীগন অনুভব করিতে পারে যে, তাহারা একটি কারবার স্থানে পৌছিয়াছে। ছোট ছোট অনেকগুলি নৌকা একত্রিতভাবে উত্তর হইতে দক্ষিনাভিমুখে কারখানার দিকে অগ্রসর হইতেছে। প্রকান্ড নৌকাসমূহ অন্য দিক হইতে আগমন করিয়া ডায়মন্ডহারবারের ন্যায় বন্দরে ভিড়িতেছে’’। 

সে সময়ের টান বন্দর আর কোল বন্দরের এই শহরের এক বন্দর থেকে অন্য বন্দরে মালামাল পারাপারে ব্যবসায়ীরা ঘোড়া আর বলদ ব্যবহার করতো।  বর্ষার সময় খালের ওপর থাকতো দুটি খেয়া নৌকা। এই  খেয়া নৌকা দিয়ে এপার-ওপারের মানুষ খাল পার হতো। ক্রমউন্নত এই শহরের ব্যবসায়ী এবং বাসিন্দাদের অসুবিধা বিবেচনা করে তৎকালিন সিরাজগঞ্জের মহুকুমা ম্যাজিষ্ট্রেট মি. বিটসন বেল সাহেব কাটাখালের ওপর একটি সেতু নির্মানের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। নির্মান খরচ ৪৫০০০ হাজার টাকা। ব্রিজ নির্মানে প্রয়োজনীয় অর্থের জোগার করতে বেল সাহেবের উদ্যোগে সামিল হলেন ব্যবসায়ীরা। শহরের বড় বড় ব্যবসায়ীদের নিয়ে গঠিত হলো কমিটি। ডিষ্ট্রিক বোর্ড  এর অনুদান ১৫০০০ হাজার টাকা।  ব্যবসায়ীদের  সহযোগিতা ৩০০০০ হাজার টাকা।  সব মিলিয়ে ৪৫০০০ হাজার টাকায়  হার্টল্যান্ড নামের ব্রিটিশ বংশোদ্ভুত প্রকৌশলীর তত্ববাধনে নির্মিত হয় ১৮০ ফুট লম্বা আর ১৬ ফুট চওড়া সেতু।  শুরুতে ৩৬০টি কাঠের প্টাাতন দিয়ে তৈরী হয় সেতুটি। কাঠের তৈরী এই সেতুটি ১৮০ ফুট লম্বা হলেও এর বাইরে দুপারে ছিল ইটের খিলান এবং বাহু। যা অনেকদূর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।১৮৮২ সালের ৬ আগষ্ট  বাংলা- আসামের গভর্ণর ছোট লাট স্যার চার্লস এলফ্রেড ইলিয়ট সিরাজগঞ্জে আগমন করেন। তিনিই উদ্বোধন করেন এই ব্রিজটি। তারই নামে নামকরণ করা হয় কাটাখালের ওপর নির্মিত সেতুর। নাম দেয়া হয় ইলিয়ট ব্রিজ। কথিত আছে যে দুর দুরান্ত থেকে কৌতুহলী মানুষ শহরে এই সেতুটি দেখতে আসেেতা।  এসে  কৌতুহলবশত গুনতো এই সেতুর কাঠের পাঠাতনের সংখ্য্যা।

পিলার বিহীন এই সেতুর নিচ দিয়ে পাট এবং পাটের তৈরী চট ও ছালা বোঝাই করে চলে যেত জেলা তথা ভারত বর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে। এমনকি ইউরোপে।  জানা যায়, বাংলা ১৩০৪ সালে ভুমি কম্পে সেতুটি ক্ষতিগ্রস্থ হয়। পাকিস্তান নামলে ১৯৬২/৬৩ সালে কারো কারো তথ্যমতে ১৯৬৬ সালে ব্রিজটি পুননির্মান করা হয়। স্বাধীনতার পর ২০০৫ সালে পুনরায় সেতুর সংস্কার কাজ করা হয়। বর্তমান সময়ে বৃটিশ আমলে নির্মিতকাঠের পাটাতনের  জায়গা দখল করেছে ইট পাথর আর লোহার সংমিশ্রনে তৈরী আরসিসি ঢালাই। বার বার নদী ভাংগন এই শহরকে ক্ষতিগ্রস্থ করেছে। নদী ভাংগনের কারনে চার বার স্থানান্তরিত হয়েছে এই শহর। কাটাখালের যমুনা নদীর দিকের মূল উৎসকে শহর রক্ষা বাধ নির্মানের কারণে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এখন আর বড় বড় পাল তোলা নৌকা কিংবা আজকের  সময়ের ইঞ্চিন চালিত নৌকা কিংবা ষ্টিমার, লঞ্চ কাটাখাল দিয়ে ভেপু তুলে যাতায়াত করে না।

সোনালী আঁশ পাটের সেই অতীত আজ আর নেই। সিরাজগঞ্জও হারিয়েছে তার পা্েটর উৎপাদন আর বাজার। কাটাখালের দুপাড়ে গড়ে উঠা সেই পাটের আড়তগুলোর জৌলুস হারিয়ে বিবর্ন হয়ে দাড়িয়েছে আছে।। কোন কোন আড়ত রুপান্তরিত হয়ে হারিয়ে ফেলেছে তার অতীত। কিন্ত এখনও হারাইনি কাটাখালের আবেদন শহরবাসীর কাছে। নতুন আংগিকে আরসিসি ঢালাই দিয়ে পুননির্মিত সেতুটি এখনো সিরাজগঞ্জ শহরের দুপারের মানুষদের সেতুবন্ধনে বেধে রেখেছে। এখনও সুর্য অস্তমিত হবার পর ব্রীজের উপর দাড়িয়ে শীতল হাওয়ায় শরীর মন জুড়িয়ে নেয়ার জন্য ক্ষণিকের জন্য হলেও দাড়িয়ে যায় পথিক। সন্ধ্যায় নিয়নবাতির আলোয় কিশোর-যুবকেরা বন্ধুদের নিয়ে আড্ডায় আড্ডায় ব্রিজ থেকে দেখে নেয় নিজ শহরের অপরূপ দৃশ্যকে। এখনও  ইংরেজের ইলিয়ট ব্রিজ শহরবাসীর ‘বড়পুল’-রাতের নিয়নবাতির আলোয় জ¦ল জ্বল করে শরবাসীকে জানিয়ে দেয় তার অতীতকে।এখনও বড় পুল নামে খ্যাত ইলিয়ট ব্রিজ- সিরাজগঞ্জের এক ঐতিহ্য হিসাবে শহরের মাঝখানে দাড়িয়ে শহরবাসীকে জানিয়ে দিচ্ছে তার অতীত গৌরবান্বিত সময়কে। শহরবাসীর কাছে ইলিয়ট ব্রিজ বড়পুল হয়ে হ্ণদয়কে আন্দোলিত করে- অতীতের কথা মনে করিয়ে দেয়। তাইতো অহংকার করে শহরবাসী বলে থাকে‘আমাদের বড়পুল’। আমাদের ইতিহাসের অংশ। আমাদের ঐতিহ্যের একটি।

ইসমাইল হোসেন, গণমাধ্যম কর্মী ও সাবেক ছাত্রনেতা ।