স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পরও স্বীকৃতি পায়নি তারা

স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পরও স্বীকৃতি পায়নি তারা

সায়েম শান্ত: শত্রুদের বুলেটে ঝাঁঝরা হয়েছে স্বজনের বুক। শেষবারের মতো লাশ আলিঙ্গনতো দুরের কথা মুখটাও দেখা হয়নি। পঁঞ্চাশটি বছর ধরে কষ্টের পাহাড় বেয়ে বেঁচে থাকা স্বজনহারা মানুষগুলোর আক্ষেপ বঙ্গবন্ধুর কৃতজ্ঞতা পত্র ছাড়া জোটেনি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, তাদের তালিকাও নেই কোথাও। মুক্তিযুদ্ধের সমৃদ্ধ ইতিহাস গড়তে এখনই শহীদদের ডাটাবেজ করার তাগিদ দিচ্ছেন গবেষকরা।

একাত্তরের রণাঙ্গন। সারাদেশের মতো উত্তাল ব্রহ্মপুত্র-তিস্তা-ঘাঘট বেষ্টিত উত্তরের জনপদ গাইবান্ধা। দেশমায়ের মুক্তির জন্য অনেকেই অস্ত্রহাতে শত্রুদের মুখোমুখি ঝাঁপিয়ে পড়েন। অনেকেই বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দেন শত্রুদের বুলেটে। দেশ মা’কে শৃঙ্খল মুক্ত করতে গিয়ে সেদিন রণাঙ্গনে যারা শহীদ হয়েছেন তাদের অনেকই পেয়েছেন শহীদের মর্যাদা। আবার যারা বিজয়ীর বেশে ফিরে এসেছেন তারা মুক্তিযোদ্ধাসহ ভূষিত হয়েছেন নানা খেতাবে। কিন্তু দেশ মায়ের পক্ষ নেয়ায় সেদিন বাড়ি থেকে, রাস্তাঘাট থেকে যাদের ধরে নিয়ে গিয়ে পাখির মতো গুলি করে হত্যার পর লাশ মাটির নীচে পুঁতে ফেলা হয়েছে তাদের ভাগ্যে জোটেনি রাষ্ট্রীয় কোন স্বীকৃতি। স্বাধীনতার পর ৫০ বছর পেরিয়ে গেলেও বঙ্গবন্ধুর একটি কৃতজ্ঞতা পত্র আর নগদ অর্থ সহায়তা ছাড়া আর কিছুই পায়নি তারা। এমনকি তাদের কোন তালিকা পর্যন্ত নেই কোথাও। এমন ভাগ্যাহত শহীদদের স্বজনরা ৫০টি বছর ধরে বেঁচে আছেন স্বজন হারানোর বেদনা নিয়ে। একাত্তরের এপ্রিল মাস। গাইবান্ধা শহরে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী আর তাদের দোসরদের নির্মম হত্যাযজ্ঞ চলছিল। আরেকদিকে শত্রুদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা। সে সময় মুক্তিযোদ্ধাদের অর্থ সহায়তা করতে গিয়ে হানাদারদের হাতে ধরা পড়েন গাইবান্ধা শহরের কালিবাড়ী পাড়ার প্রকাশ চন্দ্র চক্রবর্তী। পরে তাঁর লাশও পায়নি পরিবারের সদস্যরা। এরপর সেই পরিবারের কষ্ট যন্ত্রণার কথা বলতে গিয়ে বারবার চোঁখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিলো প্রকাশ চক্রবর্তীর স্ত্রী মুক্তা রানী চক্রবর্তীর। মুক্তিযোদ্ধাদের টাকা প্রয়োজন। তাদের টাকা দিতে হবে- এই কথা বলে তরতাজা মানুষটা সবাইকে রেখে গেলেন মুক্তিযোদ্ধাদের টাকা দিতে। এই তাঁর শেষ যাত্রা হবে-জানা ছিলোনা। ওই যে গেলো আর ফিরে এলো না। পরে জানা গেলো স্টেডিয়ামে হত্যার পর পুঁতে ফেলা হয়েছে। কাউকে কিছু বলা যায়না, জোরে কাঁদা যায়না, সন্তানদের মুখে ভাত নেই। মানুষটাকে শেষবারের মতো দেখতেও পর্যন্ত পেলাম না-কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন প্রকাশ চন্দ্র চক্রবর্তীর স্ত্রী মুক্তা রানী চক্রবর্তী। পরের কষ্টটা আরো ভয়াবহ। ২০০ ভরি সোনার গহনা, ৫০ হাজার চান্দির টাকা সব লুট করে নিয়ে বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয় হানাদাররা। পড়নে একমাত্র কাপড় আর ৮ মাসের কন্যাকে কোলে করে দুই বছরের ছেলে প্রবীর চক্রবর্তী আর চার বছরের বড় মেয়ে প্রীতিকে নিয়ে তার নিরুদ্দেশ যাত্রা। তারপর কষ্ট আর কষ্ট। মাইলের পর মাইল পায়ে হেটে ভারতে গিয়ে নেন আশ্রয়। সেখানেও সন্তানদের মুখে ভাত নেই। বারবার বাবা বাবা বলে চিৎকার করে। ওদের মিথ্যে শান্তনা দেন তোমাদের বাবা আসবে। বলতে বলতে নিশ্চুপ হয়ে যান মুক্তা চক্রবর্তী।

প্রকাশ চন্দ্র চক্রবর্তীর মতোই একাত্তরের মে মাসে শহরের ডেভিড কোম্পানী পাড়ার বাড়ি থেকে হানাদাররা ধরে নিয়ে যায় নাট্যকর্মী ও হোমিও চিকিতসক ডা. বিজয় কুমার রায়কে। দিনভর নির্যাতনের পর রাতের আধাঁরে স্টেডিয়ামের জার্সি রুমে হাত-পা বেঁধে গুলি করে হত্যা করে হানাদাররা। "বাবার আদর-যত্ন, স্নেহ-ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হন মায়ের কোলের ছয় মাসের শিশু রামকৃষ্ণ রায়। তার কাছে বাবা’র স্মৃতি বলতে শুধু বঙ্গবন্ধু স্বাক্ষরিত একটা চিঠি ছাড়া আর কিছু নেই। ডা. বিজয় কুমার রায়ের ছেলে রাম কৃষ্ণ রায় বলছিলেন খেয়ে না খেয়ে মা ভাই-বোনদের মানুষ করেছেন। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, বাবা দেশমাতৃকার জন্য জীবন দিলেন। অথচ স্বাধীনতার এত বছর পরেও রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি মেলেনি। দেশ স্বাধীনের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নগদ দুই হাজার টাকা আর একটা কৃতজ্ঞতা সনদ দিয়েছেন। এরপর আর কেউ তাদের কোন খবর রাখেনি। শেষবারের মতো বাবার মুখ দেখতে না পারার যন্ত্রণায় এখনো ঘুমোতে পারেন না কল্যাণী রানী। গাইবান্ধা শহরের ডেভিড কোম্পানী পাড়ার বাড়িতে বাবার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে চোখের জলে বুক ভেসে যায় তাঁর। কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন একাত্তরে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্ততি নিচ্ছিলেন। সদরের বল্লমঝাড়ের ইউসুবপুর গ্রামে বাবা-মা আর ৫ ভাইবোনের সংসার। ভাই-বোনরা সবাই ছোট ছোট। একাত্তরের মে মাসের কোন এক দিন পাক-বাহিনীর দোসররা তার বাবা ননী গোপাল সাহাকে ধরে নিয়ে যায়। এরপর স্টেডিয়ামে বেশ কয়েকজনের সাথে তার বাবার বুকেও বুলেট চালায়। মা-আর ভাই-বোনদের নিয়ে কল্যানীকে নামতে হয় অজানা এক যুদ্ধে। সেলাই ফোড়াই আর এর ওর কাছে চেয়ে চিন্তে নিজের আর ভাইবোনদের লেখাপড়ার খরচ জুগিয়েছেন। কল্যাণীর আক্ষেপ, যারা মুক্তিযুদ্ধে গেছেন- তারা মুক্তিযোদ্ধা, যারা মারা গেছেন তারা শহীদ। তাহলে দেশের জন্যতো তার বাবাও জীবন দিয়েছেন-তার কোন স্বীকৃতি নেই কেন।

এমন অনেক হৃদয় বিদারক গল্প আছে গাইবান্ধা জেলার আনাচে-কানাচে অনন্ত: ১শ’ ৩৬টি পরিবারে। যাদের ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যার পর মাটির নীচে গর্ত করে লাশ পুঁতে ফেলা হয়।

গাইবান্ধা নাগরিক পরিষদের আহবায়ক অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম বাবু বলেন, এই মানুষগুলো দেশের জন্য জীবন দিলো অথচ এতোদিন পরও তাদের কোন তালিকা নেই, স্বীকৃতি নেই, এটা একটা স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য লজ্জাষ্কর।

রাজনীতিক মিহির ঘোষ বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা নিয়ে প্রায়ই বিতর্ক হয়। অনেক ভূয়া নাম তালিকায় অন্তর্ভূক্ত হয়-কিন্তু এই মানুষগুলো যারা শহীদ হলেন- তারা কেন শহীদের মর্যাদা পাবে না, এটা বোধগম্য নয়।

মুক্তিযুদ্ধ গবেষক অধ্যাপক জহুরুল কাইয়ুম বলেন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে যাদের হত্যা করা হয়েছে তাদের অনেকের স্ত্রী সন্তানরাও বেঁচে নেই। এখনও যারা বেঁচে আছে এখনই তাদের নাম-ঠিকানা সংগ্রহ করে তাদের একটি তালিকা প্রস্তত করার মধ্য দিয়ে এখনই শহীদদের ডাটাবেজ করতে পারলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আরো সমৃদ্ধ হবে।

গাইবান্ধায় বেসরকারীভাবে গণহত্যা বধ্যভূমি ও গণকবর জরিপ অনুযায়ী একাত্তরের আটটি নির্যাতন কেন্দ্র ছাড়াও জেলা সদরে স্টেডিয়াম সংলগ্ন বধ্যভূমিসহ জেলার সাত উপজেলায় দশটি বধ্যভূমি ও দশটি গণকবরে ১৩৬ জন মানুষকে হত্যা করা হয়। যাদের রাষ্ট্রীয় কোন স্বীকৃতি নেই।