বিপ্লবীদের মুক্তিতীর্থ কালাপানি কারাগার

 বিপ্লবীদের মুক্তিতীর্থ কালাপানি কারাগার

একটা বিশেষ কারণে গিয়েছিলাম আন্দামান। উদ্দেশ্য ছিলো ব্রিটিশদের তৈরি কুখ্যাত কালাপানি সেলুলার জেল দেখা। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসের কথা। আন্দামানের রাজধানী পোর্টব্লেয়ারের ছোট্ট একটি এয়ারপোর্ট। নাম বীর সাভারকার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। ভারতের মহারাষ্ট্রের বাসিন্দা ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের নেতা বিনায়ক দামোদর সাভারকার জীবনের দীর্ঘ সময় কারারুদ্ধ ছিলেন কালাপানি সেলুলার জেলে। অকথ্য নির্যাতন সহ্য করেছেন কিন্তু মাথা নোয়াননি। সেই বীরের নামেই বিমানবন্দরের নাম। বিনায়ক দামোদর ছিলেন বিলেতে পড়ালেখা করা উচ্চশিক্ষিত মানুষ। তিনি একাধারে ছিলেন কবি, লেখক এবং বিপ্লবী রাজনীতিক। নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর মতোই মহাত্মা গান্ধীর অহিংস আন্দোলনে তার মোটেও আস্থা ছিলো না। আর সে কারণেই মহাত্মা গান্ধী সেলুলার জেল পরিদর্শনে গিয়ে সাভারকার যে কক্ষে ছিলেন, তা এড়িয়ে যান। এক ভাই গনেশ দামোদর সাভারকারও একই সময়ে ছিলেন এই কারাগারে। তাদের দুইজনকে এমনভাবে রাখা হয়েছিলো দুই ভাইয়ের দেখা হয়নি কোনোদিন। 
প্রথম দিনেই দেখতে গেলাম সেলুলার জেল। সমুদ্র সমতল থেকে খাড়া উপরে পাহাড়ের টিলায় উঠতেই চোখে পড়লো সেই কুখ্যাত কালাপানি সেলুলার জেলের গেট। আমার মস্তিষ্কের কোষে কোষে তখন লতা মঙ্গেশকরের অপার্থিব কণ্ঠ, একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি... । গেটের সামনেই একটি সুদৃশ্য পার্ক। নাম নেতাজী সুভাষ গ্রাউন্ড। ১৯৪৩ সালে নেতাজীর হাতে ওড়ে এখানে ভারতের জাতীয় পতাকা। তখন এটি আজাদ হিন্দ ফৌজের সদর দপ্তর। পার্কের এক পাশ দিয়ে একটু পর পর স্থাপন করা হয়েছে মৃত্যুঞ্জয়ী বিপ্লবী বীরদের প্রস্তরমূর্তি। অনেকের মধ্যে আছেন ইন্দুভূষণ রায়, বাবা ভান সিং, পন্ডিত রাম রাখাবালী প্রমুখ। সবগুলো মূর্তিই রাখা হয়েছে কারাগারের পরিবেশে। সবার হাতে পায়ে পরানো বেড়ি। এঁদের সবারই জীবনাবসান হয়েছে এই কুখ্যাত কারাগারে। কারো প্রাণ গেছে ফাঁসির দড়িতে, কারো গেছে নির্মম নির্যাতনে।


টিকেট কেটে মূল ফটক দিয়ে যখন প্রবেশ করলাম তখন বেলা পশ্চিম আকাশে বেশ খানিকটা হেলে পড়েছে। সামনেই পড়লো একটি প্রজ্জ্বলিত শিখা চিরন্তন। পাশের একটি লম্বা কক্ষে টানানো আছে বিপ্লবী বীরদের নামের দীর্ঘ তালিকা। 

বিস্মিত হয়ে দেখলাম, ভারত স্বাধীন করতে গিয়ে বিপ্লবী হয়ে যারা মৃত্যুদন্ড কিংবা জীবনসাজা নিয়ে এসেছিলেন কালাপানি কারাগারে তাদের বেশিরভাগই ছিলেন বাংলাদেশের বাঙালি। অগণিত নামের ভিড়ে চোখে পড়লো ক্ষুদিরামের সাথী অভিরাম, ভাগত সিংয়ের সাথী বটকেশ্বর দত্ত, বাঘা যতীনের সহচর বারীন্দ্রকুমার ঘোষ, উপেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি, বীরেন্দ্রচন্দ্র সেনসহ মাস্টারদা’ সূর্য সেনের অনেক সাথীর নাম। 

চমকে উঠলাম আমার নিজ এলাকা গাইবান্ধারও দু’জন বিপ্লবীর নাম ওই তালিকায় দেখে। একজন হলেন ব্যাং চৌধুরী নামে খ্যাত পরেশচন্দ্র চৌধুরী আর একজন আমার প্রিয় ছাত্র দেবাশীষ দাশ দেবুর বাবা যোগেশ চন্দ্র দাশ । অন্য আর কেউ ছিলো কিনা তা জানতে পারিনি। পরে শুনেছি এঁদের সাথে বিনয় তরফদার ও নগেন মুস্তফীও ছিলেন। ওই একই ধরণের তথাকথিত ষড়যন্ত্র মামলার আসামী হয়ে দেশে কারাভোগ করেছেন ডা. শ্রীশ চন্দ্র সরকার, সত্যেন্দ্রনাথ চাকী, ফণী গুণসহ অনেকে। এরা সবাই ছিলেন সেই সময়ের  বিপ্লবী সংগঠন ‘যুগান্তর’ ও ‘অনুশীলন’ সমিতির সদস্য এবং ব্রিটিশবিরোধী ষড়যন্ত্র মামলার আসামী। শ্রীশ বাবু ছিলেন একজন নিপাট ভালো মানুষ। একজন দরদী চিকিৎসক। তিনি যে বিপ্লবী বীরও ছিলেন এ কথা জানা হয়নি ঘুণাক্ষরে। এক ধরণের গর্ব বুকে নিয়ে ঢুকে পড়লাম কারাগারের ভেতর। 
 
পাঁচিলঘেরা বিশাল এলাকার কেন্দ্রে চারতলা উঁচু ওয়াচ-টাওয়ার। এই ওয়াচ-টাওয়ার থেকে চারপাশে বৃত্তাকারে বেরিয়ে গেছে সাতটি তিনতলার লম্বাটে আলাদা আলাদা ব্লক। ব্লকগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে এক ব্লকের বন্দিরা যেন অন্য ব্লকের বন্দিদের কিছুতেই দেখতে না পায়। এর প্রতিটি তলায় আছে বিশ থেকে ত্রিশটার মতো সংকীর্ণ সেল। কবর সদৃশ এই সেলগুলোতে রাখা হতো একজন করে নিঃসঙ্গ কয়েদী। এরকম ছয়শ’ আটানব্বইটি বন্দিকক্ষ ছিলো এখানে। এক একটি সেলে একজন করে বন্দী রাখা হতো বলে এর নাম হয়েছে সেলুলার জেল। সেই জেল আর আগের মতো নেই। ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত চারটি ব্লক ভেঙে বানানো হয়েছে হাসপাতাল। এখন বাকি আছে তিনটা। 

ইন্ডিয়ান একদল পর্যটকের সাথে ছিলো একজন স্থানীয় গাইড। তিনি হিন্দি বাংলা মিশেল করে কথা বলছিলেন। আমি সেই দলের সাথে ভিড়ে গেলাম। গাইডের বর্ণনায় অতীতের এক একটা দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগলো ছায়াছবির মতো।

শুরু সেই ১৮৫৭ সালে। তখনও নির্মিত হয়নি কালাপানি জেল। ইংরেজরা সিপাহী বিদ্রোহের বীর সেনানীদের ধরে ধরে ছেড়ে দিয়ে এলো আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের গভীর জঙ্গলে। সেখানে না ছিলো খাবার, না ছিলো মাথা গোঁজার ঠাঁই। প্রতি মুহূর্তে হিংস্র জীবজন্তুর আক্রমণ। বিষাক্ত সাপ বিচ্চুর কামড়। আদিম মানুষের বিষাক্ত তীরের আঘাত। তার উপর ম্যালেরিয়া, কলেরা, প্লেগ ইত্যাদি প্রাণঘাতি রোগ। বন্দিদের মনে হলো এ যেন পৃথিবীর বাইরের কোনো দেশ। পুরাণ থেকে উঠে আসা এক মিথিক্যাল ভ্যালি। এক মৃত্যু উপত্যকা। মাস দু’য়েকের মাথায় মারা যায় শত শত বন্দী। এই অবস্থায় ১৮৫৮ সালে দুইশ’ আটাশজন বন্দী পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু পালাবে কীভাবে? চারদিকে সমুদ্র আর ঘন অরণ্য। পালাবার উপায় তো নেই। অল্প সময়ের মধ্যে তাদের আটাশিজন ধরা পড়ে। পলায়ন চেষ্টার অভিযোগে তখনই ছিয়াশিজনকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করে রক্তপিপাসু ইংরেজরা। অন্য যারা পালাতে সক্ষম হয়েছিলো তারাও বাঁচতে পারেনি। কেউ মরেছে আদিবাসীদের বিষমিশ্রিত তীরের আঘাতে, কেউ মরেছে জঙ্গলের বিষাক্ত সাপ-বিচ্চুর কামড়ে আর অধিকাংশই মরেছে খাদ্যাভাবে। যারা উপায়ান্তর না দেখে সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়েছে তাদের খেয়েছে হাঙ্গরে।

একজন মাত্র পালাতে পেরেছিলো। তার নাম দুধনাথ। যারা পালাতে গিয়ে ঘন জঙ্গলে ঢুকে পড়েছিলো তাদেরই একজন দুধনাথ। বনের আদিম মানুষের তীরের আঘাতে অন্যরা নিহত হলেও দুধনাথ আহত অবস্থায় ধরা পড়ে তাদের হাতে। দুধনাথকে তারা নিয়ে যায় তাদের পল্লীতে। সেখানে তারা তাকে সুস্থ করে তোলে। পরে ওদের একটি মেয়েকে দিয়ে তার বিয়েও দেয়। একটা বছর সেখানে ছিলো দুধনাথ। এই এক বছরে তাদের ভাষা শিখে নেয় সে।

এই সময়ে ভারতভূখন্ড থেকে বেশি সংখ্যায় মানুষ অনুপ্রবেশ করতে থাকে আন্দামানে। আদিবাসীরা এটাকে ভালোভাবে নেয়নি। তারা তাদের দেশে এটাকে অনধিকার প্রবেশ ভেবে নতুন প্রতিষ্ঠিত উপনিবেশ ধ্বংস করার জন্য যুদ্ধপ্রস্তুতি নেয়। দুধনাথ গোপনে সেখান থেকে পালিয়ে এসে সবকথা ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষকে আগাম জানিয়ে দেয়। ফলে বন্য মানুষের সেই প্রতিরোধ যুদ্ধে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের তেমন বড় একটা ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। আর বিশ্বাসঘাতকতার পুরস্কারস্বরূপ দুধনাথ তার জীবন ভিক্ষা পায়।

১৮৭২ সাল। ভারতের তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড মেয়ো এলেন বন্দিদের অবস্থা সরেজমিনে দেখতে। তিনি এসে উঠলেন পোর্টব্লেয়ারের পাশের ছোট্ট পাহাড়ী দ্বীপ মাউন্ট হ্যারিয়েটে। নিরাপত্তার কারণে ইংরেজ সাহেবরা বাস করতেন এখানেই। 

একদিন বিকেলে সূর্যাস্তের দৃশ্য দেখার জন্য লর্ড মেয়ো নেমে এলেন সমুদ্রতীরে। সেখানে ওঁৎ পেতে ছিলো ইংরেজদের নির্মম নির্যাতনের শিকার সিপাহী বিদ্রোহের পাঠান কয়েদী শের আলি আফ্রিদি। সে খুব কাছে গিয়ে সহসাই ছুরি চালিয়ে দিলো লর্ড মেয়োর পেটে। মেয়ো মারা গেলেন। ইংরেজ শিবিরে ছড়িয়ে পড়লো আতঙ্ক। হাতে নাতে ধরা পড়লো আফ্রিদি। বিনা বিচারে তাকে দেয়া হলো মৃত্যুদন্ড। 
ফাঁসিতে ঝোলানোর আগে তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, এ ভয়ঙ্কর কাজটা তুমি কেন করলে?
শের খান নির্ভীক কণ্ঠে উত্তর দিলো, উছ্ জালেমকো মারনে কিলে খুদা নে মুঝকো বোলায়া।
আবার প্রশ্ন, এখন কি তোমার অনুতাপ হয়?
নেহি, কোয়ি আপসোস নেহি। ম্যাঁয় তো কোয়ি গলতি নেহি কিয়া।
আবার তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, তোমার কি কিছু বলার আছে?
সেকথার কোনো জবাব না দিয়ে ফাঁসির দড়ি মুখে নিয়ে একবার চুম্বন করলো আফ্রিদি, তারপর ফাঁস নিজেই গলায় পরে চিৎকার করে বললো, আল্লাহু আকবার, ইনকিলাব জিন্দাবাদ।  

শের আফ্রিদির লাশ সমুদ্রে নিক্ষেপ করা হলো। মাউন্ট হেরিয়েটের যেখানে এই ঘটনা ঘটেছিলো ঠিক সেই জায়গায় বানানো হয়েছে একটি স্মৃতিস্তম্ভ। স্তম্ভের গায়ে লেখা আছে এই কাহিনী। শের খানের কাহিনী এখানে লোকের মুখে মুখে। আন্দামানে শের খান এখন জাতীয় বীর।

এই ঘটনার পরেই পোর্টব্লেয়ারের খুব কাছেই ভাইপার আইল্যান্ডে বানানো হয় প্রথম জেল। ভারত থেকে স্বাধীনতাকামী হাজার হাজার বিপ্লবীকে বন্দী করে পাঠিয়ে দেয়া হয় আন্দামানে। এখানে স্থান সংকুলান না হওয়ায় আঠারশ’ ছিয়ানব্বই সালে পোর্টব্লেয়ারে শুরু হয় সেলুলার জেল নির্মাণ। ছয়শ’ কয়েদীর অমানবিক শ্রমে সেলুলার জেলের নির্মাণ কাজ শেষ হয় ১৯০৬ সালে।

দলবল নিয়ে গাইড এসে দাঁড়ালো একটা সেলের সামনে। গাইড বলতে লাগলেন, এই যে দেখছেন ছোট্ট একটি সেল। এরূপ নির্জন সেলে একাকি দিনরাত কাটতো একজন বন্দির। পরনে চটের পোশাক। সামনে আট শিকের লোহার গরাদ। তারপরও গলা থেকে পা পর্যন্ত ডান্ডাবেড়ি। বসে থাকার উপায় নেই। সারাক্ষণ ছিলতে হতো নারিকেল। নারিকেলের ছাল দিয়ে তৈরি হতো হাজার হাজার গজ দড়ি। শাঁস চলে যেতো ঘানিতে। তৈরি হতো মণকে মণ নারিকেল তেল। 

নির্জন সেলে একা থাকতে থাকতে পাগল হয়ে যেতো কেউ কেউ। প্রলাপ বকতো দিনরাত। মাথা ঠুকতো লোহার গরাদে। নিরূপায় হয়ে অভিশাপ দিতো সভ্য দুনিয়ার মানুষকে।  

মাঠের মাঝখানে চারদিক খোলা একটা লম্বা দো-চালা ঘর। সারা ঘরে সারি সারি তেলের ঘানি। কয়েদীদের বুকে জোঁয়াল দিয়ে ঘোরানো হতো এসব ঘানি। এমন কি রাজনৈতিক বন্দিদের দিয়েও করানো হতো এ কাজ। দুপুরে সামান্য সময় খাবারের বিরতি দিয়ে সারাদিন চলতো ওই একই কাজ। একটু বিশ্রাম নিতে গেলেই পিঠে পড়তো গোরা সিপাইয়ের নির্মম চাবুক। সহ্য করতে না পেরে অজ্ঞান হয়ে যেতো অনেকে। কেউ এই কষ্টের কাজ করতে অসম্মতি জানালে তার ভাগ্যে জুটতো কঠিন শাস্তি। দু’হাতে হাতকড়া পরিয়ে পেরেক ঠুকে দিনের পর দিন বেঁধে রাখা হতো দেয়ালের সাথে। খানাপিনা বন্ধ।
 

গেট সোজা দুই ব্লকের মাঝখানে প্রকাশ্যে সাজানো আছে হুইপিং স্ট্যান্ড। সেলুলার জেলের ভয়ঙ্কর অত্যাচারের নির্মম সাক্ষী। কেউ যদি কখনো কোনো অন্যায়ের প্রতিবাদ করতো তাহলে তৎক্ষণাৎ তাকে হুইপিং স্ট্যান্ডে এনে তার হাত-পা-মাথা বেঁধে ফেলা হতো। পিঠ উদোম করে তাতে লাগানো হতো তেল কিংবা চর্বি। চাবুক মারার নির্দেশ দেয়া হতো তারই একজন সাথী কয়েদীকে। মারতে মারতে সে ক্লান্ত হয়ে পড়লে ইংরেজ সার্জেন্টের চাবুক পড়তো তার পিঠে। এভাবে চাবুক মারতে মারতে পিঠের চামড়া বলে কিছু থাকতো না। মুখ দিয়ে উঠে আসতো রক্ত। হাতপায়ের বেড়ি খুলে দিতেই ঢলে পড়তো মৃত্যুর কোলে। 
অনেক সময় রাজনৈতিক বন্দিরা প্রতিবাদ করতেন এই অকথ্য অত্যাচারের। তখন তাদেরও দেয়া হতো অনুরূপ শাস্তি। অজ্ঞান হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তারা চিৎকার করে প্রতিবাদ করতেই থাকতেন। গালি দিতেন। সাদা চামড়ার কেউ কাছাকাছি এলে ওই অবস্থায় থু থু ছিটিয়ে দিতেন তার মুখে। অপমানের জ্বালায় সাদা চামড়ার মানুষটা তখন দ্বিগুণ তেজে ঝাঁপিয়ে পড়তো বন্দির উপর। মৃত্যু নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত চালিয়ে যেতো চাবুক। 

অফিসের পাশেই ফাঁসিঘর। একসাথে তিনজনকে ফাঁসি দেয়ার ব্যবস্থা। পুরোনো দড়ি নেই। কিন্তু নতুন দড়ি ঝুলছে আগের মতোই। অনেককে মৃত্যুর সাজা শুনিয়েই আনা হতো আন্দামানে। বিশেষ করে রাজনৈতিক বন্দিদের আনা হতো লোকচক্ষুর আড়ালে ফাঁসি দেয়ার জন্য। আবার কারাগারের ভেতরে তুচ্ছ কারণে বন্দিদের দেয়া হতো ফাঁসি। এভাবে কতো জনকে যে ফাঁসির দড়িতে ঝুলে প্রাণ দিতে হয়েছে তার লেখাজোখা নেই।

কখনো কখনো তিন জনকে একসাথে ঝোলানো হতো ফাঁসির দড়িতে। লাশগুলো চটের বস্তায় ভরে নিয়ে যাওয়া হতো সবার চোখের সামনে দিয়ে। নিক্ষেপ করা হতো সমুদ্রের পানিতে। ফাঁসি দেয়ার পূর্ব মুহূর্তে বেজে উঠতো পাগলা ঘণ্টি। জাগিয়ে তোলা হতো সব কয়েদীকে। সবাই বুঝতে পারতো কারো না কারো ফাঁসি হচ্ছে। প্রায় প্রতিদিন ভোরে মাতম উঠতো কারাগারে। শোনা যেতো আল্লাহু আকবার কিংবা বন্দে মাতরম্ ধ্বনি। কখনো সমস্বরে ধ্বনি উঠতো, ইনকিলাব জিন্দাবাদ। 

আমরা যখন ফিরে এলাম গেটের কাছে তখন সকলের চোখ পানিতে পূর্ণ। শুধু গাইডই থাকলেন নির্বিকার।

১৯৩৭ সালে কালাপানি-বন্দিদের মুক্তির দাবীতে সারা ভারত উত্তাল হয়ে ওঠে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর মহাত্মা গান্ধীর উপর্যুপরি আহবানে অবশেষে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে ইংরেজ সরকার একরূপ বাধ্য হয়েই কালাপানি সেলুলার জেলের সকল বন্দীকে মুক্তি দেয়। ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ স্বাধীন হলে এখানেও ইউনিয়ন জ্যাক পতাকা নামিয়ে উত্তোলন করা হয় স্বাধীনতার পতাকা। 

কালাপানি সেলুলার জেল এখন আর নির্যাতনের নরক নয়। এখন ভারতের অন্যতম জাতীয় জাদুঘর। এখন এটি পরিণত হয়েছে মুক্তির মন্দিরে। প্রতিদিন শত শত মানুষ আসে এখানে। পূর্ব-পুরুষদের ত্যাগের কাহিনী শুনে অশ্রুসিক্ত হয়। বেদিতে বেদিতে পরম শ্রদ্ধায় নিবেদন করে প্রাণের অর্ঘ্য।

অধ্যাপক মাজহারউল মান্নান : শিক্ষাবিদ ও লোক গবেষক