গাইবান্ধার কৃষিপণ্যের চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখতে চান বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পদক প্রাপ্ত  কৃষক আমির আলী

গাইবান্ধার কৃষিপণ্যের চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখতে চান বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পদক প্রাপ্ত  কৃষক আমির আলী

আরিফুল ইসলাম বাবু: সহায়তা পেলে বিভিন্ন প্রকার ফলসহ কৃষি পন্যের চাহিদা পুরন করতে পারবেন বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পদক প্রাপ্ত গাইবান্ধার কৃষক আমির আলী ১৯৮৭ সালে ষষ্ঠ শ্রেনীতে পড়াবস্থায়  নতুন বই কেনার জন্য ১’শ ১০ টাকা যোগাড় করতে পারেননি দিনমজুর বাবা। ছেলেকে বলেছিলেন, অনেক চেষ্টা করেও তোমার লেখাপড়ার টাকা যোগাড় হলনা। তোমাকে আর লেখাপড়া করাতে পারবনা,তুমি আমার সাথে দিনমজুরের কাজ শুরু কর। তারপর লেখাপড়া ছেড়ে বাবার সাথে দিনমজুরের কাজ শুরু করেন। প্রায় তিন বছর দিনমজুরের কাজ করা অবস্থায় স্থানীয় একটি বেসরকারী সংগঠন থেকে সহায়তা হিসেবে পেপে গাছের একশ চারা  আর একটি পা’টিউবওয়েল পান। আট শতক জমিতে পেপে গাছ এর পাশে তিনি নিজে বুদ্ধি খাটিয়ে সাথী ফসল হিসেবে আদা গাছও রোপন করেন। প্রথম দফা চাষেই কুড়ি হাজার টাকা মুনাফা পেয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠেন কৃষিকাজে । এরপর আর তাঁকে পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি। দিনের পর দিন খেয়ে না খেয়ে,শরীরের ঘাম ঝড়িয়ে আজ তিনি প্রায় চার একর জমিতে গড়ে তুলেছেন অসংখ্য প্রকারের ফল ও কৃষিপন্য।

সফল এই কৃষক গাইবান্ধা জেলার সাঘাটা উপজেলার পুটিমারী গ্রামের আমীর আলী । অক্লান্ত পরিশ্রমে এখন তিনি প্রায় চার একর জমির বিভিন্ন অংশে অন্ত:ত ১০ থেকে ১২ রকম ফসল চাষ করে কোটি টাকা উপার্জন করছেন। এরই মধ্যে ২০১৭/১৮ সালে পেয়েছেন বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পদক। প্রায় চার একর জমির বিভিন্ন অংশের কোনটিতে লাগিয়েছেন মাল্টা, কমলা, তিল, আখ (কুষার),কলা। কোনটিতে রয়েছে আদা,সীম,পটল,চিচিঙ্গা,পেয়ারা,পেঁপে,লেবু, করলা, টমেটো। এসব চাষাবাদে তিনি রাসায়নিক সার ব্যবহারের পরিবর্তে গবাদি পশুর বর্জ্যের সাথে নিমপাতা মিশিয়ে প্রাকৃতিক জৈব সার ব্যবহার করে থাকেন। তাঁর জমিতে বারি ফোর,বারি ওয়ান,বারোমাসী,বাংলা লিংক ভূটান ও ভিয়েতনাম জাতের পাঁচ জাতের মাল্টা। কমলা রয়েছে ছাতক,নাগপুরী,সাংহাই চায়না,কাশ্মিরী ও দার্জিলিং জাতের। দেশী,আইভরী কোষ্ট ও সিটলেছ নামের তিন জাতের লেবু রয়েছে। শুধু অর্থনৈতিক স্বাবলম্বীতাই নয় কৃষক আমীর আলীর বাগানগুলো যেন সবুজের সমাহার। চারিধারে থোকায় থোকায় ঝুলছে সবুজ মাল্টা,কমলা,জাম্বুরা,লেবু,পেয়ারা। সেসবের মধ্য থেকে মাথা উঁচু করে দাড়িয়ে আছে ১৫ থেকে ২০ ফিট লম্বা আকর্ষনীয় আকারের গেন্ডারী কুষার (আখ)। কোন কোন ক্ষেতে মাচায় ঝুলছে পটল,ঝিঙে,সীম আর মাটি ফুড়ে সবুজ ঘন পাতা নিয়ে দাড়িয়েছে আদাগাছ। রয়েছে তিল,টমেটো,করলাসহ হরেক রকম সব্জি । চোখ জুড়ানো বিশাল সবুজের সমারোহে দেখা মিলল এলাকার তরুন উদ্যোক্তা সাইফুলের। তিনি জানালেন, লেখাপড়ার পাশাপাশি কৃষিকাজে আগ্রহ রয়েছে তার। কৃষক আমীর আলীর গল্প জেনে তিনি এসেছেন পরামর্শের জন্য।  বাগান দেখে অভিভুত সাইফুল জানালেন, চাকুরীর খোজে ক্লান্ত হয়ে আমরা অহেতুক হতাশায় পড়ে যাই। অথচ আমীর ভাইয়ের এই একই জমিতে একাধিক ফসল চাষের পদ্ধতি অবলম্বন করে আমরাও স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে পারি,ঘটাতে পারি ভাগ্যের পরিবর্তন। গাইবান্ধার ফলের বাজারেও বিক্রি হচ্ছে কৃষক আমীর আলীর বাগানের  বিভিন্ন ফল ও কৃষি পন্য।

প্রয়োজনীয় সরকারী সহায়তা পেলে সারা দেশে ফলমুলসহ বিভিন্ন কৃষিপন্যের চাহিদা পুরন করতে পারবেন দাবি করে কৃষক আমীর আলী বলেন, সাম্প্রতিক পাঁচ দফা বন্যায় চাষাবাদে তিনি চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এর মাঝে ন্যায্য দাম না পেয়ে রাগে কষ্টে করলা,টমেটো রাস্তায় ফেলে দিয়েছেন। সে সময় জেলা প্রশাসন,কৃষি বিভাগ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যাংক ঋন সহায়তার ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য কার্যত এখনও মেলেনি ব্যাংক ঋন সহায়তা। শুধু সেটিই নয়,তিনি আরও অভিযোগ করে বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অত্যন্ত কৃষি বান্ধব। কৃষকদের দু:খ দুর্দশা লাঘবে তিনি কৃষি প্রনোদনাসহ বিভিন্ন সুযোগ সুবিধার পদক্ষেপ গ্রহন করে আসছেন। অথচ সরকারী দপ্তরের মাঠ পর্যায়ের অনেক কর্মকর্তাই সেভাবে এগিয়ে আসেননা। বিশেষ করে ব্যাংকগুলোতে কথা বলার সুযোগই পাওয়া যায়না। আমার যে পরিমান জমি রয়েছে সেসবের কাগজপত্র জমা রেখে নিয়ম মেনেই তো আমি ঋন পেতে চাই। কিন্তু আমরা কৃষকরা অবহেলিত, আমাদের কথা শোনার সময় ওনারা পান না।  এ প্রসঙ্গে গাইবান্ধা কৃসি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের উপ পরিচালক মাসুদুর রহমান বলেন, কৃষক আমীর আলী দেশের সম্পদ। তিনি বঙ্গবন্ধু কৃষি পদক প্রাপ্ত একজন সফল কৃষক। কৃষকদের অনুপ্রানিত করবার জন্য আমরা আমীর আলীর বাগান পরিদর্শন করিয়ে থাকি। কেন তিনি প্রয়োজনীয় কৃষি ঋন পাচ্ছেন না, সে বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহনের আশ্বাস দেন এই কর্মকর্তা। কৃষক আমীর আলীর কৃষিকাজে এলাকার দুই নারী কৃষিশ্রমিকসহ পাঁচজন সহায়তা করে নিজেরাও স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছেন। এখানে কর্মরত কৃষি শ্রমিক রানা মিয়া বলেন, টাকা উপার্জনের জন্য ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে কাজকর্ম করেছেন। এখন আমীর আলীর বাগানে কাজ করে তার সংসারে স্বচ্ছলতা এসেছে বলে জানান তিনি। কৃষক আমীর আলীর সফলতার গল্প দেশ বিদেশে ছড়িয়ে যাওয়ায় গর্বিত এলাকার মানুষজনও। তারা বলেন,আমীর আলীর কারনে গাইবান্ধার প্রত্যন্ত এই গ্রামটি আজ পরিচিত। তাঁর মতন অন্যরাও কৃষিকাজে মনোযোগী হয়ে উঠলে আশানুরুপ ফলাফল পাবে বাংলাদেশ। প্রতিদিনই একটু একটুু করে কমছে চাষাবাদের জমি। তাই শুধু সফল কৃষকের পরিচিতিই নয়, চাহিদা পুরনের জন্য একই জমিতে একাধিক ফসল চাষের পরামর্শ কৃষক আমীর আলী ও গাইবান্ধা কৃষি বিভাগের।