আর কত প্রাণ চায় দানব কাকড়া?

আর কত প্রাণ চায় দানব কাকড়া?

হেদায়েতুল ইসলাম বাবু: বাড়ির পাশের পুয়্যামাড়ি বিলে দাড়কি পাতিয়ে রাখতেন আব্বা। ভোর বেলা দেখতাম দাড়কি থেকে তরতাজা মাছ নিয়ে উঠানে মাকে ডাকছেন তিনি। দাড়ক্যা, পুটি, পুয়্যা মাছের সাথে টুকড়িতে চলে আসতো ছোট-বড় কাকড়া। শৈশবে কাকড়া ধরতে গিয়ে সে যে কি বিপদে পড়েছিলাম, আজও মনে হলে ভয়ে গা শিউরে ওঠে। কাকড়ার ধারালো পা এমনভাবে হাতের আঙ্গুল কামড়ে ধরলো, সেদিন আমার চিৎকারে পাড়ার মানুষ সব জড়ো হয়ে গেলো। তারপর থেকে কাকড়া দেখলে এখনো ভয় পাই। এখন আরো বেশী ভয় পাই। এই ভয় মরে যাওয়ার। কাকড়া দেখলে বুকটা ধড়ফড়িয়ে ওঠে। তবে এই কাকড়া পাতানো দাড়কিতে আটকানো কাকড়া নয়। এ এক দানব কাকড়া। এই কাকড়া কাউকে চিমটি দেয়না, কামড় দেয়না, আচড়ও দেয়না। আস্তো একটা মানুষ পিষে মারে। জলে-স্থলে সমানতালে দাপিয়ে বেড়ায়। সড়ক-মহাসড়কে তার রাজত্ব অনেকদিনের। কোন এক সময় জমি চাষের জন্য নিয়ে আসা ট্রাক্টরের পেছনে বডি লাগিয়ে আমরাই রুপ দিয়েছি যানবাহনে। চলনে বলনে, শব্দে বেশ ভয়ঙ্কর বলে সাধারণ মানুষ নাম দিয়েছে কাকড়া। সামনটা সরু পেছনটা চ্যাপ্টা। চাকাগুলো বড় বড়। রাস্তায় দেখলেই যেকোন মানুষের বুক ধড়ফড়িয়ে ওঠে। কারন কিন্তু অযৌক্তিক না। প্রায় প্রতিদিন সড়ক মহাসড়কে শিশু, নারী, পুরুষ পিষে মারলেও বীরদর্পে দাপিয়ে বেড়ায়। কেউ কিচ্ছু করেনা, বলেওনা। আজও (সোমবার, ৮ ফেব্রুয়ারী) এক মায়ের বুক খালি হয়েছে। গাইবান্ধা শহরতলিন পুলিশ লাইন্স পাশে ইন্দিরারপাড় এলাকায় এই কাঁকড়া পিষে মেরেছে ৯ বছরের শিশু জাহিদকে। সংবাদকর্মী হিসেবে এমন খবর লিখতে লিখতে হৃদয়টা পাষন্ড হয়ে গেছে। বুকটা যেন শিলপাটার চেয়েও কঠিন হয়ে গেছে। সন্তানহারা মা-বাবাদের চোখের জল দেখতে দেখতে আমার চোখে আর জল গড়ায় না। শুধুইকি ইন্দ্রারপাড়, দিন কয়েক আগে গাইবান্ধা সদরের কুমারপাড়ায় অবৈধ ট্রাক্টর কাকড়ার চাকায় পিষ্ট হয়ে একজন প্রাণ হারিয়েছে। সোমবার (১ ফেব্রুয়ারী) সন্ধ্যার আগে গাইবান্ধা সদর উপজেলার খোলাহাটি ইউনিয়নের কুমাড়পাড়া নামক স্থানে ইঁট ভাটায় মাটিবাহী একটি ট্রাক্টরের সাথে অটো বাইকের মুখোমুখি সংঘর্ষে ঘটনাস্থলেই অজ্ঞাত এক ব্যক্তি মারা যান। এসময় গুরুতর আহত হন অটো চালক রানা মিয়া। এর আগে গত ৫ জানুয়ারী সুন্দরগঞ্জে অবৈধ এই ট্রাক্টরের চাকায় পিষ্ট হয়ে এক শ্রমিক, ২৩ জানুয়ারী সদরের ভবানীপুরে এক শিশু, একই দিনে সাদুল্লাপুরে সাইকেল আরোহী এক শিশু, ২৯ জানুয়ারী পলাশবাড়িতে এক জন প্রাণ হারায়। গত কয়েক বছরে গাইবান্ধার সাত উপজেলায় কাকড়ার চাকায় প্রাণ হারানো মানুষের দীর্ঘ তালিকা লিখে শেষ করা যাবেনা। কত শত মানুষ মারা গেছে তা হিসেব না করে বলা কঠিন। আচ্ছা, দিন-রাত, রোদ-বৃষ্টি-ঝড়, উপেক্ষা করে আমাদের ট্রাফিক ভাই-বোনেরা রাস্তাঘাটে দু'পায়ের উপর দাড়িয়ে দায়িত্ব পালন করে। পেশাগত কাজে বেরুতে গিয়ে প্রতিদিনই ট্রাফিক ভাইদের মুখোমুখি হতে হয়। তাদের কষ্টকে বারবারই স্যালুট জানাই। কিন্তু মোটরসাইকেলের মতো ছোট ছোট যানবাহন গুলো যখন তাদের চোখ এড়াতে পারেনা, তখন কাকড়ার মতো দানবগুলো তাদের চোখ এড়ায় কিভাবে- এই প্রশ্ন শুধু আমার নয়, আরো অনেকের। এবার আসা যাক কাকড়ার স্টিয়ারিং থাকে কাদের হাতে। মাত্র শৈশব পেরিয়ে কৈশোরে পা রাখা টগবগে তরুণদের দস্যিপনার সাথে যখন আরেকটা দস্যু যানবাহনের স্টিয়ারিং যোগ হয় তখন শক্তিটা যে দ্বিগুন হয়, তাতে কোন সন্দেহ নেই। আর এই দুই শক্তির কাছে আমাদের অসহায়ত্ব কোথায় নেমেছে এইটুকুই বা ভাববে কে? চালকদের কোন প্রশিক্ষণ নেই, কাকড়ার কোন রেজিষ্ট্রেশন নেই, বৈধতা নেই। তারপরও চলে, তাহলে এই বাহনের প্রভাব-প্রতিপত্তির উচ্চতা কত দুর, তাদের পেছনের কুশিলবদের হাত কত লম্বা তাই বা পরিমাপ করবে কোন যন্ত্র। গাইবান্ধায় বিআরটিএ বলে সরকারের একটা প্রতিষ্ঠান আছে তাদের চোখে ছানি পড়েছে কি না আমার জানা নেই? রাস্তাঘাটে কাকড়ার নীচে স্বজনহারা অসহায় মানুষের আর্তনাদ না হয় পুরু দেয়াল ভেদ করে ট্রাফিক বিভাগ-জেলা প্রশাসনের কানে পৌছোয়না, অসংখ্য উন্নয়নের ফাইল পত্র সামলাতে গিয়ে পত্রিকার কালো হরফে ছাপা অক্ষরগুলো দেখার সময়টাই বা কখন? যাক সেসব কথা, আমার জন্মভূমি গাইবান্ধার সংসদ সদস্য, মহান জাতীয় সংসদের হুইপ মাহাবুব আরা বেগম গিনি একজন মা। মায়েদের হৃদয় অনেক বেশী কোমল, সন্তানহারানোর কষ্ট মায়ের চেয়ে কেউ উপলব্ধি করার কথা নয়। মাগো, কাকড়ার যদি স্থানীয় চাহিদা তৈরি হয়ে থাকে তাহলে চালকের আসনে প্রশিক্ষিত কাউকেতো বসানো যায়, রেজিষ্ট্রেশনের মধ্যদিয়ে একটা শৃঙ্খলায়তো আনা যায়, সবার জন্য আইন হলে কাকড়া আর কতকাল আইনের বাইরে থাকবে? সবাই যখন দেখেও দেখেনা তখন আপনি ছাড়া আর কাকে ভরসা করবো বলেন। আজ যারা মানুষের নিরাপত্তার দায়িত্বে থেকেও দায়িত্বহীনভাবে সব এড়িয়ে যাচ্ছেন, আপনাদেরও সন্তান আছে, স্বজন আছে। ওই দানব যেদিন আপনার পরিবার পরিজনের দিকে ধেয়ে আসবে সেদিন আপনি নিজেকে সামলাতে পারবেনতো? লেখক: গণমাধ্যমকর্মী।